বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজার বিদায়ে রয়ে গেল কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে (৮,০৫১ মিটার) ভয়াবহ তুষারধসে বিশ্বখ্যাত নেপালি পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজাসহ ১০ জনের মৃত্যু শুধু পর্বতারোহণ

2026-08-05T19:50:10+00:00
2026-08-05T19:50:10+00:00
 
  বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজার বিদায়ে রয়ে গেল কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫০ পিএম 
নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজা। সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে (৮,০৫১ মিটার) ভয়াবহ তুষারধসে বিশ্বখ্যাত নেপালি পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজাসহ ১০ জনের মৃত্যু শুধু পর্বতারোহণ জগৎকে শোকাহতই করেনি, বরং জন্ম দিয়েছে একের পর এক প্রশ্নের। বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ অক্সিজেন ছাড়াই দ্বিতীয়বার আরোহণের ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন পুরজা। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। 

নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় তথ্যচিত্র ফোরটিন পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠা নির্মল পুরজা ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে রেকর্ড গড়েছিলেন। এবার তার লক্ষ্য ছিল অক্সিজেন ছাড়াই দ্বিতীয়বার সবগুলো শৃঙ্গ আরোহণ করা। পাকিস্তানে মূলত গাশেরব্রুম-২ আরোহণের পরিকল্পনা নিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ব্রড পিকও আরোহণ করবেন। 

অভিযানে রওনা হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, এটি তার পরিকল্পনায় ছিল না। তবে ব্রড পিক জয় করতে পারলে শুধু চো-ওইউ বাকি থাকবে এবং তখনই তিনি নতুন ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবেন।  

তিনি লিখেছিলেন, ব্রড পিক, আমি তোমার কাছে শুধু নিরাপদে ওঠা-নামার সুযোগ চাই। আমি কোনো পর্বতকেই হালকাভাবে নিই না। 

কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। গত ৩০ জুলাই ক্যাম্প-৩ থেকে চূড়ার দিকে ওঠার সময় একটি শক্তিশালী তুষারধস তাদের ওপর আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় নির্মল পুরজাসহ ১০ পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়।

অভিজ্ঞ পর্বতারোহী অ্যালান আর্নেটের মতে, দুর্ঘটনার আগের কয়েক দিন ভারী তুষারপাত ও প্রবল বাতাসে পাহাড়ের ঢালে বিপুল পরিমাণ অস্থিতিশীল বরফ জমেছিল। তার মতে, ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি ঢালবিশিষ্ট ওই এলাকা তুষারধসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এমন পরিস্থিতিতে অভিযাত্রীদের ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত তাকে বিস্মিত করেছে।

প্রকৃতপক্ষে দুর্ঘটনার আগেই আবহাওয়া নিয়ে সতর্কবার্তা ছিল। হাঙ্গেরির পর্বতারোহী ডেভিড ক্লেইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়ান ওভারটন অক্সিজেন ছাড়া ব্রড পিক আরোহণের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভারী তুষারপাতের কারণে তারা ২৫ জুলাই বেস ক্যাম্প ত্যাগ করেন। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ অভিযাত্রী দলই তখন তাদের অভিযান গুটিয়ে নেয়। অথচ পুরজার নেতৃত্বাধীন বলে ধারণা করা এলিট এক্সপেডের দলসহ কয়েকটি দল পাহাড়ে থেকে যায়।

হিমালয়ান ডাটাবেসের পরিচালক বিলি বিয়ারলিং বলেন, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা সবার এক নয়। কেউ সতর্ক থাকেন, আবার কেউ বেশি ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত থাকেন। তবে ঠিক কী কারণে কয়েকটি দল থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এই ঘটনায় আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো— চারটি পৃথক অভিযাত্রী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা কীভাবে একই দলে বা একই রুটে একসঙ্গে ছিলেন। এলিট এক্সপেড, সেভেন সামিট ট্রেকস, মুভিং মাউন্টেনস এবং ইমাজিন নেপালের সদস্যরা ওই সময় একই পথে ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি যে তারা কোন আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করে অভিযান চালিয়ে গিয়েছিল।

জিপিএস তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই ভোরে দলটি ক্যাম্প-২ থেকে যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কিছু আগে নির্মল পুরজা ও ওমানের পর্বতারোহী নাধিরা আল-হার্থির অবস্থান প্রায় ৬ হাজার ৬৬০ মিটার উচ্চতায় শনাক্ত হয়। এরপরের সংকেতে দেখা যায়, তারা দুই হাজার ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছেন— যা তুষারধসের ইঙ্গিত বহন করে।

প্রথমদিকে আশা করা হয়েছিল, হয়তো কয়েকজন জীবিত আছেন। কারণ পুরজার ট্র্যাকিং ডিভাইস কিছু সময় সংকেত পাঠাচ্ছিল। পরে বিশ্লেষণে জানা যায়, বরফের নিচে চাপা পড়া জিপিএস যন্ত্রের অবস্থানগত ত্রুটির কারণেই এমন সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। গত ১ আগস্ট এলিট এক্সপেড আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মল পুরজার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন নেপালের কিলি পেম্বা শেরপা, নিমা শেরপা, নাওয়াং থিন্ডু শেরপা, গ্যালজেন ‘গ্যালু’ শেরপা ও পুর বাহাদুর ‘ইউক্তা’ গুরুং, পাকিস্তানের সোহাইল সাখি, ওমানের নাধিরা আল-হার্থি, চীনের ওয়াং ঝং এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যালোরি গেইস। এর মধ্যে আল-হার্থি ছিলেন এভারেস্ট জয়ী প্রথম ওমানি নারী।


এই দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পর্বতারোহীদের বিভিন্ন ফোরামে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— যখন অধিকাংশ দল খারাপ আবহাওয়ার কারণে অভিযান স্থগিত করেছিল, তখন পুরজাদের দল কেন ঝুঁকি নিল? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন তুষারপাতের পর বরফ স্থিতিশীল হতে সময় লাগে। সেই সময় না দিয়েই অভিযানে গেলে তুষারধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অনেক পর্বতারোহী একসঙ্গে অস্থিতিশীল ঢাল অতিক্রম করলে ধসের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। 

তবে বিলি বিয়ারলিং কাউকে দায়ী করতে নারাজ। তার মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকে সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা সহজ নয়। পাহাড়ে ঝুঁকি সব সময়ই থাকে এবং পর্বতারোহণের সঙ্গে তুষারধসের মতো বিপদ সর্বদাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। 

এদিকে, উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় হেলিকপ্টার পরিচালনার সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি মরদেহ এখনো পাহাড়েই রয়ে গেছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ চলছে। তবে উদ্ধারকারীরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনেক মরদেহ দ্রুত নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। 

নির্মল পুরজার মৃত্যু শুধু একজন কিংবদন্তি পর্বতারোহীর জীবনাবসান নয়, এটি উচ্চ পর্বতারোহণে ঝুঁকি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার অসমাপ্ত স্বপ্নের পাশাপাশি ব্রড পিকের এই ট্র্যাজেডি চিরকাল পর্বতারোহণ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   নির্মল পুরজা  মৃত্যু  নেপাল  পর্বতারোহী 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: