যুদ্ধ অবসানে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পুনর্গঠন ও আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দিয়ে চুক্তি করা হবে, নাকি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দ্রুত ধ্বংস করা হবে— এ নিয়ে তাকে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এক বিবৃতিতে তাঁর মন্তব্যকে ‘প্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে আরও ভয়াবহ, কঠোর ও অনির্দেশ্য হামলা চালানোর জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও জানায়।
তবে ট্রাম্পের কড়া বক্তব্যের মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। প্রায় সাত মাস ধরে চলা এ সংঘাত শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, বেড়েছে জ্বালানির দাম এবং সংঘাতে প্রতিবেশী দেশগুলোও জড়িয়ে পড়েছে।
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে। দিনভর মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ করেছেন। আলোচনাগুলো গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে আগ্রহী মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাসের চালান এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
তবে এসব দেশ দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক। একই সময়ে এসব দেশের অনেকগুলোতেই বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বারবার হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতি ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে, এমনকি তার আগেও হতে পারে। তবে কখন কী হবে, তা নিশ্চিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। সংঘাত কমাতে কাতার কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে তেহরান। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনের কাছে সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নৌযানের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়া সম্ভব বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি বলেন, ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিজের ক্ষমতা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়— ট্রাম্পকে তা বুঝতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে সংঘাত
ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বিষয়ে কাতারের একটি প্রস্তাব ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠকে আলোচনায় এসেছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। একটি সূত্র বলেছে, ইরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, এ ধরনের ব্যবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর বিষয় থাকতে হবে।
এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সৌদি আরবও চলতি মাসে সংঘাতের আরও গভীরে জড়িয়ে পড়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনে অগ্রসর হয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। এতে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানিও হুমকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের তেল সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। রয়টার্সের সূত্র বলছে, সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত পরিমাণে তেল রপ্তানি আবার শুরু করতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচ