মাত্র আধা কিলোমিটার মহাসড়কে মাসের পর মাস চলছে সংস্কার কাজ। তার উপর টানা বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের আমতলী এখন যানজটের নিত্য ভোগান্তির কেন্দ্র। এই আধা কিলোমিটার পথকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় দেশে অর্থনীতির লাইফলাইনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্নভাবে হাইওয়ে পুলিশ টহল চালিয়েও গতি বাড়াতে পারে না সড়কে, সড়ক সংস্কার না হলে পুলিশ নিরুপায় — এমনই ভাষ্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। তবে কবে নাগাদ মহাসড়কের এই আধা কিলোমিটার সংস্কার শেষ হবে — এমন প্রশ্নের জবাবে বার বার বৃষ্টির দোহাই দিলেও অজানা কারণে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি নন সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালেও ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আমতলী এলাকাকে কেন্দ্র করে । সকাল থেকে কুমিল্লা সদর উপজেলার আলেখারচর এলাকা থেকে সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সকাল সাড়ে ১১ টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত যানজট ভেঙ্গে ধীরগতির যানবাহনের সারি আরও বিস্তৃত হচ্ছিল।
মহাসড়কের আমতলীতে যানজটের চিত্র প্রায় প্রতিদিনেরই। হাইওয়ে পুলিশ বলছে, কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস সংলগ্ন আমতলী এলাকায় আধা কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ গত তিন মাস ধরেই চলছে। কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ চলমান থাকায় একপাশ বন্ধ রেখে চলে আরেকপাশের কাজ। তবে বিপত্তি দেখা দিয়েছে, বিকল্প লেনে যান চলাচলের যে পথ করা হয়েছে টানা বৃষ্টিতে তাতেও দেখা দিয়েছে বড় বড়গর্ত।
এছাড়া সেখান থেকে কাঁদাপানি ছড়িয়ে কাছাকাছি সড়কের ভালো জায়গাগুলোও নষ্ট হচ্ছে। বড় বড় গর্তের কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় যানজটের সূত্রপাত হয়। পথে দীর্ঘ সময় থেমে থাকার ভোগান্তি এড়াতে অনেক যানবাহন উল্টো পথ ব্যবহার করতে চাইলে এই যানজট আরও বাড়ে। শুক্রবার সকালে ঢাকামুখী লেনে এই যানজট আলেখারচর থেকে সুয়াগাজী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়। ভোগান্তিতে পরে শত শত যানবাহন ও হাজারো যাত্রী।
যানজট নিরসনে ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার একাধিক মোবাইল টিমের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার ওসির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান বলেন, গত তিন মাস ধরে এই অংশে সংস্কারকাজ চলমান। এরই মধ্যে সংস্কারকাজের আশপাশের অংশও ভেঙে যাচ্ছে। যানবাহনের তীব্র চাপ এবং দীর্ঘ যানজট নিয়ন্ত্রণে গত তিন দিন ধরে আমাদের পুলিশ সদস্যরা দিন-রাত মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্রুত সড়ক সংস্কার করা না হলে দিন দিন জনভোগান্তি আরও বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের জন্য সওজ বিভাগকে বারবার অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত অস্থায়ী বা স্থায়ী কোনো কার্যকর সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কির্তিমান চাকমা বলেন, বৃষ্টি হলেই আমতলী এলাকার ভোগান্তি নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। গত তিন থেকে চার সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে মহাসড়কের এই অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল সড়কের পাশাপাশি সংস্কারকাজ চলাকালে ব্যবহৃত বিকল্প অংশেও পানি জমে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত দুই দিনে শুধু এই স্থানেই অন্তত চারটি মালবাহী ট্রাক গর্তে আটকে যায়। পরে রেকার দিয়ে সেগুলো সরিয়ে নিতে হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি একাধিকবার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই যানজট বাড়ছে এবং জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করছে।
মহাসড়কে আটকে পড়া কয়েকজন চালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে। এতে জ্বালানি অপচয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এই রুটে চলাচলকারী এশিয়া লাইন বাস চালক হানিফ সরকার জানান, বাস যেমন তেমন সব জায়গা দিয়ে চলে যায়। ভারী ট্রাক বা নিচু প্রাইভেট কার গর্তে নামতে চায় না। তাদের ধীর গতির কারণে পুরো জ্যামটা লাগে।
ট্রাক চালক আমজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত তিনটা মাস আমার চট্টগ্রাম একটানা আসা যাওয়া করতে হয়- আর ঢাকায় ফিরতেই আমি এখানেই আটকাতে হয়। মালামালে ভারী থাকে ট্রাক। চাইলেও এই গর্ত দিয়ে চালাতে পারি না। পিঁপড়ার মত চলতে হয়।
যানজটে আটকে থাকা যাত্রী ব্যবসায়ী সোহান আহমেদ বলেন, ঢাকা- চট্টগ্রাম হাইওয়ে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার করতে হবে। সংস্কার যেমন টেকসই হতে হবে তেমনি সংস্কারের আগে টেকসই বিকল্প পথও তৈরি করতে হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, সংস্কার আর দুর্ভোগ সমানে চলছে। এভাবে তো চলা যায় না।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় যানবাহনে আটকে থাকায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার করে মহাসড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আমতলী অংশের সংস্কারকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম এর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/আতা