যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের বাসিন্দা টড মন্টগোমারি। তার বাড়ির চারপাশে সবুজ গাছপালা, ছোট্ট বাগান। হঠাৎই বাড়ির আঙিনায় ছোট একটি টিউবের ঢাকনা খুলে শত শত মশা ছেড়ে দেন তিনি। তবে এটি দুষ্টুমি করে নয়, বরং মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ।
বার্তা সংস্থা এএফপি’র খবরে এ তথ্য উঠে এসেছে। তিনি যে মশাগুলো ছাড়েন, সেগুলো সবই পুরুষ মশা। পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না। এদের শরীরে ওলবাকিয়া নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া থাকে। এসব পুরুষ মশা যখন এই ব্যাকটেরিয়াবিহীন স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন স্ত্রী মশার ডিম আর ফুটে না। ফলে নতুন মশার জন্ম বন্ধ হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ এবারই প্রথম। গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ পুরো এলাকায় প্রায় ৬ লাখ এশিয়ান টাইগার মশা ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মশা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘বি সেফ মসকুইটো কন্ট্রোল’-এর ৩২ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা টড মন্টগোমারি এএফপিকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যেন একটি টিকটিক করা সময়বোমার ওপর বসে আছি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা বারা র কারণে উষ্ণ ও আর্দ্র দিনের সংখ্যা বেড়েছে। এতে রোগবাহী মশার বংশবিস্তার ও সক্রিয় থাকার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে।
‘জ্যাপ মেলস ’ নামে বাজারজাত এই পদ্ধতি শুধু এশিয়ান টাইগার মশার ওপর কার্যকর। এই মশা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় প্রজাতি নয়, তবে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করে।
সম্প্রতি উত্তর ভার্জিনিয়ায় স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রথম ঘটনা শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কেন্টাকির বাসিন্দা ও সাবেক বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মন্টগোমারি প্রতিরক্ষা খাতে চাকরির জন্য ওয়াশিংটন এলাকায় আসেন।
পরে ২০২৩ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার লক্ষ্য ছিল আবাসিক এলাকায় মশা দমনে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের বিকল্প তৈরি করা।
বর্তমানে কীটতত্ত্বে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত মন্টগোমারি বলেন, দেশীয় উদ্ভিদ ও পরাগায়নকারী প্রাণীর প্রতি আমার আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা। নিজের বাড়ির আশপাশে কীটনাশক ছিটাতে দেখে মনে হয়েছে, এর একটি নিরাপদ বিকল্প প্রয়োজন।
মন্টগোমারির গ্রাহকদের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রচলিত কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের পরিবার ও পোষা প্রাণীদের রক্ষা করতে চান। বিশেষ করে বাইফেনথ্রিন নামের বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিকটি সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেকেই এর ব্যবহার এড়িয়ে চলছেন।
৬৭ বছর বয়সী স্যান্ড্রা মারকুয়ার্ট বলেন, আমাদের একটি সুন্দর বাগান আছে। কিন্তু মে বা জুনে গাছ লাগানোর পর অক্টোবর পর্যন্ত মশার উপদ্রবের কারণে সেখানে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
স্তন ক্যানসার জয়ী মারকুয়ার্ট টেকসই বস্ত্র নিয়ে পরামর্শ দেন এবং একটি ছোট কৃষিপণ্যের বাজার পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, নিজের বাড়িতে কখনো কীটনাশক স্প্রে করাতে চাননি। তবে প্রতিবেশীরা স্প্রে করানোর পর তাদের স্বস্তি দেখে কখনো কখনো হিংসাও হতো।
ওলবাকিয়া পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি অবিশ্বাস্যভাবে কার্যকর। এখন তিনি স্বামীর সঙ্গে বাড়ির বারান্দায় বসে নিশ্চিন্তে খাবার খেতে পারেন, বাগানেও কাজ করতে পারেন। আগে যেভাবে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হতে হতো, এখন আর তা হয় না।
এ পর্যন্ত ২৫ জন গ্রাহক এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। প্রত্যেকে ১৬ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার পুরুষ মশা পাচ্ছেন।
ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া মশার শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যদি পুরুষ মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া থাকে কিন্তু স্ত্রী মশার শরীরে না থাকে, অথবা ভিন্ন ধরনের ওলবাকিয়া থাকে, তাহলে তাদের মিলনের পর ডিম নিষ্কিয় হয়ে যায় এবং বংশবিস্তার বন্ধ হয়।
এ ধরনের কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সরকারি উদ্যোগ চলছে সিঙ্গাপুরে। ‘প্রজেক্ট ওলবাকিয়া’ নামে ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটিরও বেশি পুরুষ মশা ছাড়া হচ্ছে।
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি ৭০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস করেছে।
গত মে মাসে একই ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় ৩ কোটি ২০ লাখ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে গুগল।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ