সিলেটের ওসমানীনগরে বেঙ্গল পরিবহনের একটি এসি স্লিপার বাসের সঙ্গে ইউনিক পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দেশে অনুমোদনহীনভাবে চলাচল করা স্লিপার বাস নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনায় জড়িত বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি যে একটি এসি স্লিপার বাস ছিল, তা নিশ্চিত করেছেন সিলেট হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপারও। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বলছে, দেশে স্লিপিং বা স্লিপার বাস পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। ফলে বছরের পর বছর এসব বাস কীভাবে মহাসড়কে চলাচল করছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সোয়া ৭টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের এসি স্লিপার বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। আহত হন বহু যাত্রী।
দুর্ঘটনার পর বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, দেশে স্লিপিং বাসের কোনো অনুমোদন নেই। মালিকপক্ষ প্রথমে সাধারণ এসি বাস হিসেবে নিবন্ধন ও ফিটনেস নেয়। পরে বাসের অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু পরিবর্তিত কাঠামোর জন্য নতুন করে কোনো অনুমোদন বা ফিটনেস পরীক্ষা হয় না। তার ভাষায়, গাড়ির মূল নকশা পরিবর্তন করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তিনি জানান, বেঙ্গল ও ইউনিক পরিবহনের বাসের অনুমোদন সিলেট নয়, সম্ভবত ঢাকা বিআরটিএ থেকে নেওয়া হয়েছে।
সিলেট হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম এই প্রতিবেদককে বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িত বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি একটি এসি স্লিপার বাস। অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসি স্লিপার বাস অবৈধ, এ বিষয়ে বিআরটিএ আমাদের কোনো তথ্য বা নির্দেশনা দেয়নি। যদি তারা চিঠি দিত, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতাম। একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিকভাবে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতেও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়ের করা এক রিটের পর তথ্য অধিকার আইনের আওতায় বিআরটিএ লিখিতভাবে জানায়, ভারত থেকে আমদানি করা চেসিসে নির্মিত স্লিপার বাস চলাচলের কোনো অনুমতি তারা দেয়নি। ওই তথ্যের ভিত্তিতে অননুমোদিত স্লিপার বাস চলাচল বন্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরাও নিশ্চিত করেছেন, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি একটি স্লিপার বাস ছিল। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া জানান, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে তারা ঢাকায় ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তার সঙ্গে থাকা বন্ধু সাইফুল ইসলাম ঘটনায় নিহত হন।
বিআরটিএ বলছে, স্লিপার বাসের কোনো অনুমোদন নেই। আবার হাইওয়ে পুলিশের দাবি, এ ধরনের বাস অবৈধ হওয়ার বিষয়ে বিআরটিএ থেকে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। দুই সংস্থার এই অবস্থান অনুমোদনহীন স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ওসমানীনগরের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, এমন বাস বছরের পর বছর কীভাবে দেশের মহাসড়কে চলাচল করেছে এবং এর দায় নেবে কে।
সময়ের আলো/আতা