আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি বাবাকে হারিয়ে যেন তারা একান্ত পরামর্শককেই হারালেন। দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারে তার বাবা হোর্হে মেসির ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। বাবা হিসেবে পাশে থাকার পাশাপাশি মেসির দীর্ঘদিনের এজেন্ট ছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত ও আলোচনাতেও যুক্ত ছিলেন হোর্হে। মেসির কাছে তাই বাবা সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন।
বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিজের অনুভূতির কথা বলেছেন মেসি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, খেলার বিষয়ে বাবার সঙ্গে আমি অনেক কথা বলি। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি আমার পাশে ছিলেন। একটা ম্যাচ শেষ করেই তাকে মেসেজ দিতাম, অথবা কথা বলতাম। খেলাধুলা ও জীবন— সবকিছুই আমি বাবার সঙ্গে ভাগ করে নিই। ছোটবেলা থেকেই আমি নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলাম, কিন্তু সব সময় বাবার অনুমতি আমার প্রয়োজন হতো। একটা ম্যাচ শেষ করে তাকে জিজ্ঞেস করতাম, কেমন খেলেছি? একবার ভালো খেলছিলাম, কিন্তু টেন্ডনে চোট পেয়েছিলাম। ঠিকমতো সেরে ওঠেনি, ফলে খেলা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি তার সঙ্গেই বড় হয়েছি।
বাবার সমালোচনা আরও ভালো খেলোয়াড় হতে সাহায্য করেছে বলেও জানিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, বাবা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি আমার খুব সমালোচনা করতেন, আর সেটাই আমাকে সব সময় আরও ভালো করার চেষ্টা করতে বাধ্য করেছে। তিনিও জানেন, নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক আমি নিজেই। তবে মায়ের কাছে আমি সব সময়ই সেরা ছিলাম। আমি খুব খারাপ খেললেও তিনি মনে করতেন, আমি ভালো খেলেছি। সব মায়ের মতোই— কখনোই আমার দোষ হতো না।
হোর্হের সঙ্গে নিজের স্বভাবের মিলও খুঁজে পেয়েছিলেন মেসি। তিনি বলেছিলেন, আমি বাবার অনেক বৈশিষ্ট্য পেয়েছি। তবে তিনি সারাদিন কাজ করতেন, আমাদের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটানোর সুযোগ হতো না। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, রাতের খাবারের সময় বাড়ি ফিরতেন। যখন আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, সেটা উপভোগ করতেন। তিনি কখনো আমার ওপর চিৎকার করতেন না। তাকে আমি মিস করতাম। এখন আমি ভাগ্যবান যে নিজের সন্তানদের সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটাতে পারি। সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে আমি আমার বাবা-মায়ের মতো হওয়ার চেষ্টা করি।
ফুটবল নিয়ে বাবা-ছেলের আলোচনাও ছিল নিয়মিত। মেসি বলেছিলেন, হোর্হে ফুটবল ভালোবাসেন, আমার সঙ্গে ফুটবল নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। বার্সেলোনা ও জাতীয় দলের হয়ে আমার ম্যাচ নিয়ে আমরা কথা বলি, এটুকুই। এরপর হাসতে হাসতে যোগ করেছিলেন মেসি, আমরা দুজন অনেক বিষয়েই একইভাবে দেখি।
বাবার সমালোচনাকে মেসি কখনো নেতিবাচকভাবে নেননি। বরং সেটিই তাকে আরও ভালো করার তাগিদ দিত। মেসির ভাষায়, আমি হয়তো দারুণ একটা ম্যাচ খেলেছি, কিন্তু বাবা বলতেন, ‘একটা গোল মিস করেছ।’ তিনি মজা করে বলতেন, এতে আমার ভালো লাগত, আরও উন্নতি করতে ইচ্ছা করত। আমরা দুজনই নিজেদের সবচেয়ে বড় সমালোচক।
তবে ছেলের ক্যারিয়ার নিয়ে হোর্হেকে ঘিরে নানা সমালোচনা ও অভিযোগে ক্ষুব্ধও হয়েছেন মেসি। বিশেষ করে জাতীয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাবার প্রভাব আছে— এমন অভিযোগকে বরাবরই অস্বীকার করেছেন তিনি।
মেসি একবার বলেছিলেন, আমার বাবাকে নিয়ে অন্য খেলোয়াড়দের বাবার চেয়ে অনেক বেশি কথা বলা হয়। বলা হয়েছে, আমি আর বাবা মিলে জাতীয় দল নির্বাচন করি, তিনিই খেলোয়াড় বেছে দেন। তাকে এমন অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। আমার ব্যাপারে এমন কথা বলা এক বিষয়, কিন্তু আমার বাবাকে নিয়ে বলা? শেষ পর্যন্ত ভুগতে হয় পরিবারকেই। আমি নিজেকে আড়াল করতে পারি, খেলায় মন দিতে পারি; কিন্তু আমার পরিবারের জন্য বিষয়টা খুব কঠিন।
সময়ের আলো/আআ