অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে বন্ধ হয়েছে ৩৫ কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত বন্ধ বা উৎপাদনহীন কোম্পানির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী পুঁজিবাজারে

2026-08-09T05:30:40+00:00
2026-08-09T05:30:40+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে বন্ধ হয়েছে ৩৫ কোম্পানি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত বন্ধ বা উৎপাদনহীন কোম্পানির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নিষ্ক্রিয় বা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে এখন ৩৫টিতে পৌঁছেছে। 

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মূলধন তুলে নেওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে কারখানা বন্ধ রাখা, শেয়ারধারীদের লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করা এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে চরম অস্বচ্ছতা বজায় রাখার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে।

পুঁজিবাজারে এসব বন্ধ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে প্রায়ই নানা ধরনের ভুয়া গুজব ছড়ানো হয় এবং কৃত্রিমভাবে দর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পকেট কাটার চেষ্টা চলে। এ ধরনের কারসাজি থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করতে এবং বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ডিএসই নিয়মিত বিরতিতে নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলোর তালিকা প্রকাশ ও হালনাগাদ করছে। 

ডিএসইর সূত্রে দেখা গেছে, এই ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একেকটি কোম্পানির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণ ও সময়সীমা কাজ করেছে। কোনোটি দীর্ঘ দুই দশক ধরে বন্ধ রয়েছে, আবার কোনোটি সাম্প্রতিক সময়ে এসে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে বাধ্য হয়ে কারখানার চাকা বন্ধ করেছে।

দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ হলো খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই দশক ধরে অর্থাৎ ২০০২ সাল থেকেই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একইভাবে প্রকৌশল খাতের বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস ২০১৬ সাল থেকে তাদের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। 

তবে তালিকার সিংহভাগ কোম্পানিই মূল ধাক্কাটি খেয়েছে ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। বৈশ্বিক মহামারি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট এবং দেশের ভেতরের নানাবিধ পরিচালন সংকটের মুখোমুখি হয়ে একের পর এক কোম্পানি তাদের কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

জ্বালানি সংকট ও চুক্তি জটিলতায় ব্যাহত উৎপাদন : বস্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় ও সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান হামিদ ফেব্রিক্স পর্যাপ্ত চাপসম্পন্ন গ্যাস না পাওয়ায় এবং বিকল্প হিসেবে সিএনজি বা এলএনজি ব্যবহার করে কারখানা চালানো অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় ২০২৫ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে লে-অফ ঘোষণা করে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র অভাব এবং উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তারা আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।

একই চিত্র দেখা গেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রেও। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল), বারাকা পাওয়ার এবং জিবিবি পাওয়ারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকট, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সরকারি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল সময়মতো না পাওয়ার কারণে তাদের কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন স্থবির রাখতে বাধ্য হয়। খাদ্য খাতের সুপরিচিত নাম রহিমা ফুড করপোরেশন বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে এবং সঠিক সময়ে মানসম্মত কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের নারকেল তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট বন্ধ করে দেয়।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই মূলত চলতি মূলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) চরম অভাব, ব্যাংক ঋণের পাহাড়সম বোঝা ও ঋণের সুদের চাপ, কারখানার মূলধনি যন্ত্রপাতির জরাজীর্ণ অবস্থা এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনার চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রমে পৌঁছেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হওয়া বড় ধাক্কাটি এসেছে প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পক্ষ থেকে। ব্যাংকিং জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সামগ্রী আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খুলতে না পারা এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে কোম্পানিটি তাদের সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে।

পুঁজিবাজারের বর্তমান চিত্র ও উত্তরণের পথ : ডিএসইর হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে এই এক্সচেঞ্জটিতে তালিকাভুক্ত মোট ইকুইটি বা কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬০টিতে। বাজার সক্ষমতা অনুযায়ী এসব কোম্পানিকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ১৬০টি, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৭৪টি এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১২৬টি কোম্পানি। বন্ধ অনেক প্রতিষ্ঠানই ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ডিএসইর মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন ঝুঁকিপূর্ণ ‘জেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত, যার ভেতরে ৩৫টি কোম্পানি পুরোপুরি অলস হয়ে পড়ে আছে।

বর্তমানে ডিএসই কর্তৃপক্ষ ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এসব বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের হঠাৎ অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি বা কৃত্রিম লেনদেন রুখতে কড়া নজরদারি জোরদার করেছে। পাশাপাশি বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে আইনকানুনে সংশোধন এনে অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে মূল বাজার থেকে আলাদা করা এবং তালিকাভুক্তির নিয়মে কঠোরতা আনার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে বাজার বিশ্লেষক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, কেবল সতর্কবার্তা জারি বা ক্যাটাগরি অবনমন নয়, কোম্পানিগুলোকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে নিয়ে পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তর অথবা চূড়ান্তভাবে বাজার থেকে বাদ দেওয়ার (ডি-লিস্টিং) মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এসব নামসর্বস্ব কোম্পানির কাগুজে শেয়ারের পেছনে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ আটকে থাকবে এবং পুরো পুঁজিবাজারের ওপর থেকে আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব হবে না।

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   অনিশ্চয়তা  ঝুঁকি  কোম্পানি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: