দেশের ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘদিন ধরে চাপে রাখা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার নজিরবিহীন এবং কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া এবং ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করে অভিজাত জীবনযাপন করা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের আর ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। দেশের আইনি সীমানা পেরিয়ে বিদেশে গড়ে তোলা তাদের গোপন সম্পদ চিহ্নিত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে একযোগে মাঠে নামানো হয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আটটি আন্তর্জাতিক আইন, ফরেনসিক অডিট ও পেশাজীবী সংস্থাকে।
বিদেশে অবস্থানরত খেলাপিদের সম্পত্তি শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরানোর এই মেগা উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপিরা প্রথম টার্গেটে : বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে বলেন, ব্যাংকগুলোর ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) উপাত্ত এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বিশাল অঙ্কের ঋণের একটি বড় অংশই নানা কৌশলে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে- এমন ৪২টি বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে এই বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। আরিফ হোসেন খান বলেন, উচ্চ অঙ্কের ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ না করা অনেক ঋণগ্রহীতাকে বর্তমানে দেশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দেশে তাদের যে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি জামানত হিসেবে রাখা আছে, তা বিক্রি করে খেলাপি ঋণের সামান্য অংশই আদায় সম্ভব। ফলে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও গড়ে তোলা সম্পদের সন্ধান মেলে কি না, তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার এই সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধান চলবে বিশ্বজুড়ে ১২টি অর্থনৈতিক কেন্দ্রে : বাঙালি পাচারকারী ও বড় খেলাপিরা সাধারণত যেসব দেশে সম্পদ গড়ে তোলেন বা অর্থ বিনিয়োগ করেন, এমন ১২টি দেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এই অনুসন্ধানী মিশন। অনুসন্ধানের আওতায় আসা প্রধান দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (বিশেষ করে দুবাই), কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া।
সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই ১২টি দেশে চিহ্নিত খেলাপিদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নামে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন, বেনামি মালিকানা এবং বর্তমান বাজারমূল্য যাচাই-বাছাই করছে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলো। বিদেশের মাটিতে সম্পদ শনাক্ত হওয়া মাত্রই ওই দেশের স্থানীয় আইন অনুযায়ী তা স্থগিত ও জব্দের জন্য দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ময়দানে ৮ আন্তর্জাতিক আইনি ও অডিট সংস্থা : গোপন সম্পদের হদিস মিললে তা যেন আন্তর্জাতিক আইনি জালে আটকা পড়ে, সে জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অডিট, লিগ্যাল ও ইনভেস্টিগেটিভ ফার্মগুলোকে চুক্তিভুক্ত করা হয়েছে।
এই অভিযানে সরাসরি কাজ করছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস। বিশ্বজুড়ে লিগ্যাল ট্র্যাকিং ও করপোরেট ইনভেস্টিগেশনে এসব সংস্থার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দুই ধাপের সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান : টাকা উদ্ধারের এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে দুটি প্রধান ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) যে ১১টি হাই-প্রোফাইল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে, তাদের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানে যুক্ত রয়েছে দেশের চার প্রধান সংস্থা- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। দেশীয় এসব সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলো সমন্বিত কাজ করছে। দ্বিতীয় ধাপে সিআইবি তালিকার ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপির খাতায় থাকা ৪২টি বড় শিল্প ও ব্যবসায়ী গ্রুপের বিদেশের সব আর্থিক লেনদেন ও স্থাবর সম্পত্তিতে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিদেশি টিমগুলোকে।
‘নো রিকভারি, নো ফি’ : ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিমুক্ত মডেল : আন্তর্জাতিক স্তরের পেশাজীবী সংস্থাগুলোকে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে সাধারণত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রাথমিক ফি হিসেবে দিতে হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো কৌশলগতভাবে এমন এক চুক্তি নিশ্চিত করেছে যাকে বলা হচ্ছে- ‘উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ বা ‘নো রিকভারি, নো ফি’ মডেল।
এই শর্তের ফলে কাজ শুরু করার আগেই ব্যাংকগুলোকে রিজার্ভ থেকে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হচ্ছে না। নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিজ খরচে তদন্ত ও আইনি লড়াই পরিচালনা করবে। বিদেশের আদালত বা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে অর্থ দেশে উদ্ধার করে আনতে পারলেই কেবল উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ বা অংশ তারা পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য এই পদক্ষেপ এক নতুন আশার আলো। বিদেশে থাকা সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করা সম্ভব হলে তা ঋণখেলাপিদের ওপর এক ধরনের প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে, যা তাদের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বা পাওনা পরিশোধে বাধ্য করতে পারে।
তবে খাত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিদেশের মাটিতে সম্পত্তি শনাক্ত ও জব্দ করা ততটা সহজ নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সেখানকার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে এটিই এখন পর্যন্ত নেওয়া সবচেয়ে সাহসী ও বাস্তবসম্মত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে