ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ তুমুল উত্তেজনার পর এলো সমঝোতা। শেষ পর্যন্ত সমাধান এলো আলোচনার টেবিলেই হলো সহাবস্থানে রাজি, দেওয়া হলো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার অঙ্গীকার। ঢাকা আলিয়ায় ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘাতের এক সপ্তাহের মাথায় সমঝোতার পর হলে ফিরেছেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। একইভাবে বরিশালের বিএম কলেজ ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের পর দেখা যাচ্ছে সমঝোতার উদ্যোগ। তা হলে প্রশ্ন উঠছে, যে সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব হলো, তার জন্য এতটা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ানোর প্রয়োজন হলো কেন?
ঢাকা আলিয়ায় সমঝোতার পর হলে উঠলেন শিবিরের নেতাকর্মীরা : সংঘর্ষের এক সপ্তাহের মাথায় পুরান ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার আবাসিক হলে সহাবস্থান নিশ্চিতে সম্মত হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বৈঠকে এ ঐকমত্য হয়। এর ভিত্তিতে সোমবার দুপুরে হলে উঠেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়ে ৪ আগস্ট সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ। এর জেরে বিকালে মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার সামনে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষের পর এক পর্যায়ে ওই এলাকা থেকে সরে যান ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। তখন হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চলে যেতে বলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পরে হলের ফটকগুলোতে তালা লাগিয়ে দেন তারা। গত রোববার ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা হলে উঠতে গেলে তাদের বাধা দেয় পুলিশ।
এরপর গতকাল রাতে দুই সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বসেন সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপালসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। সেই বৈঠকে ঢাকা-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ এবং ঢাকা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ছাত্রদলের পক্ষে ঢাকা আলিয়ার ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং ছাত্রশিবিরের পক্ষে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সভাপতি ইমদাদুল হক মিয়াজী ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম অংশ নেন। বৈঠকে হলে ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ বজায় রাখার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি সংঘাত, বিশৃঙ্খলা কিংবা শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়- এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নেতারা।
বৈঠকের ব্যাপারে ছাত্রদলের ঢাকা মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার শাখার নেতা সাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বৈঠকে উভয় পক্ষই নিজেদের অভিযোগগুলো তুলে ধরেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। হলে যে লুটপাট হয়েছে, সেটি দুই পক্ষই করেছে। বৈঠকে শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা হলো এখন সমঝোতার মাধ্যমে হলে সিট বণ্টনের বিষয়টি সমাধান করা হবে। ছাত্রদল একবার প্রশাসনের সঙ্গে বসবে এবং ছাত্রশিবিরও একবার প্রশাসনের সঙ্গে বসবে।’
গতকাল দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার দিকে ছাত্রশিবির হলে অবস্থান নিয়েছে জানিয়ে সাদ বলেন, এ সময় ক্যাম্পাস প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যাদের হলকার্ড রয়েছে এবং যারা হলকার্ডের জন্য আবেদন করেছেন, তারা হলে প্রবেশ করছেন। বর্তমানে মূলত কে কতটি সিট পাবেন, সেই সমাধানের দিকেই বিষয়টি এগোচ্ছেন।
এ বিষয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান বলেন, ‘সংঘাতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই এবং সামনে সংঘাত হবে এমনটাও আশা করছি না। আমরা আশা করছি, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির হলে এবং ক্যাম্পাসে সহাবস্থান বজায় রাখবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে কী হয়েছে, সে বিষয়ে বিচার-বিবেচনা বা পর্যালোচনা না করে সামনের দিনে শিক্ষার পরিবেশ, সুস্থ পরিবেশ এবং সুস্থ ক্যাম্পাস বিনির্মাণে সবাই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। আমরা সেটাই প্রত্যাশা করছি।’
হলে সিট বণ্টনের বিষয়ে ছাত্রশিবিরের এই নেতা বলেন, ‘আমরা ১১ দফা দাবি দিয়েছি। আমাদের কথা ছিল, মেধার ভিত্তিতে বৈধ শিক্ষার্থীরা সিট পাবে। আমরা এই দাবিই জানিয়েছি। শিক্ষকদের সঙ্গে আরেকটি মিটিং হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই মিটিংয়ের পরে বোঝা যাবে, সিট নিয়ে প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’
বিএম কলেজেও বৈঠকে কাটে উত্তেজনা : বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ ক্যাম্পাসে সম্প্রতি সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নিরসনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাদের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলেজ প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে উভয় পক্ষই ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সহাবস্থান বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মো. তাজুল ইসলামের আহ্বানে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কলেজের শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যরা, বরিশাল মহানগর ও বিএম কলেজ ছাত্রদলের নেতা এবং ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সাম্প্রতিক ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি, সংঘাত কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
কলেজ অধ্যক্ষ ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাঙ্গনের প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন কোনোভাবেই শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কিংবা কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত না করে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত শিক্ষকরাও ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বা উত্তেজনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মতবিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।
বৈঠক শেষে উভয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা ক্যাম্পাসে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তারা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কলেজ প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে সাম্প্রতিক উত্তেজনার অবসান ঘটেছে এবং বিএম কলেজে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংঘর্ষের এক দিন পরই একসঙ্গে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সভাপতি : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল দুটি সংগঠন। এ ঘটনার এক দিন পরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত কর্মসূচিতে দুই সংগঠনের সভাপতিদের একসঙ্গে দেখা গেছে।
গত সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন এবং শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব মুরাদকে একসঙ্গে অংশ নিতে দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় তারা সামনের সারিতে ছিলেন। পরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর সঙ্গে একই মঞ্চে অংশ নেন দুই ছাত্রনেতা।
বেরোবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব মুরাদ বলেন, ছাত্রদল কোনো প্রোগ্রাম করেছে আর আমরা কখনো বাধা দিয়েছি এমন কোনো ঘটনা নেই। আমরা আগেও যেমন বাধা দিইনি, এখনও দিই না। আমরা চাই ক্যাম্পাস সহাবস্থানে থাকুক, স্থিতিশীল পরিবেশে থাকুক। আমরা আশা করি, তারা যে শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস লিখেছে এটা দুপুরের মধ্যে মুছে দেবে।
ছাত্রদল সভাপতি ইয়ামিন ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আমরা ত্রাসের রাজনীতি থেকে মুক্তি পেয়ে সুন্দর একটা বাংলাদেশ পেয়েছি। জুলাই যেমন আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল সেই ঐক্যবদ্ধভাবেই নতুন বাংলাদেশে গড়তে হবে। মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব রাখা যাবে না। তা না হলে আবারও ফ্যাসিবাদীরা ফিরে আসবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে