রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহিদ শামসুজ্জোহা হলের কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় কালাচ সাপের কামড়ে নুরনবী ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হলের ১৩৮ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি।
আহত নুরনবী ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, ভোরে ঘুমন্ত অবস্থায় নুরনবীর বিছানায় উঠে তার পায়ে সাপটি দংশন করে। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চিৎকার শুরু করেন। তার চিৎকারে রুমমেটরা ঘুম থেকে উঠে কক্ষে সাপটি দেখতে পান। পরে দ্রুত তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
রামেকের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক শামীম আহমেদ শিক্ষার্থীকে সাপে দংশনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ভোরে বিষধর সাপের কামড়ে আহত এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাকে ‘কমন ক্রেইট’ বা পাতি কালাচ সাপ দংশন করেছে। তাকে ইতোমধ্যে দুই ডোজ অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত।
ঘটনার পর ওই কক্ষ থেকে প্রায় তিন ফুট লম্বা কালাচ সাপটি উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সোয়ান’।
সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ শেখ বলেন, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে খবর পেয়ে তারা দ্রুত ওই কক্ষে যান। পরে প্রায় তিন ফুট লম্বা কালাচ সাপটি নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তার ভাষ্য, কক্ষ অপরিচ্ছন্ন ও অগোছালো থাকলে এ ধরনের সাপের উপস্থিতি বাড়তে পারে। উষ্ণতার সন্ধানে কালাচ কখনো মানুষের বিছানায় উঠে আসতে পারে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় শরীরের সংস্পর্শে এলে অজান্তেই দংশনের ঘটনা ঘটতে পারে।
নুরনবীর রুমমেট হাবিবুর রহমান বলেন, সাপ কামড় দেওয়ার পরপরই নুরনবী ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করতে থাকেন। পরে তারা সাপটি দেখতে পান। এরপর দ্রুত নুরনবীকে রাবি মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাবিবুর রহমান আরও বলেন, এর আগেও হলের বিভিন্ন কক্ষে সাপ ঢোকার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে হল সংসদ ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার প্রশ্ন, শিক্ষার্থী আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
শহিদ শামসুজ্জোহা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আল-আমিন সরকার বলেন, এর আগেও হলে সাপ প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এরপর হলের আশপাশের ঘাস পরিষ্কার করা হয়েছে, সাপ প্রতিরোধে সার্কেল দেওয়া হয়েছে এবং সামনের দুই পাশে ব্লিচিং পাউডার দেওয়া হয়েছে। এরপরও পাঁচতলায় সাপ পাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন। সাপটি কীভাবে কক্ষে ঢুকেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। এখন থেকে সাপ প্রতিরোধে আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এ এইচ এম খুরশীদ আলম বলেন, সাপের কামড়ে আক্রান্ত শিক্ষার্থী বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছেন। তাকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছে এবং আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হলের প্রাধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সভাপতির সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারাও হাসপাতালে যাচ্ছেন। তিনি সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীর পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে রাকসুর পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, এর আগেও জোহা হলে সাপ প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। হল প্রাধ্যক্ষকে বারবার জানানোর পরও ১৫ দিনের মধ্যে পুরো হলে নেট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে রোববার দুপুর ১২টার মধ্যে হলের চারপাশের ঝোপঝাড় ও আবর্জনা পরিষ্কার এবং পুরো হলে নেট স্থাপনের দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীর ওই দিনের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা বাতিলেরও দাবি জানান।
শহিদ শামসুজ্জোহা হল সংসদের ভিপি আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও হলের পরিবেশের স্বার্থে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ঘাস কাটার মেশিন ও স্নেক নেটসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও গড়িমসি কেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির অপেক্ষা করা উচিত নয়। কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়, প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা। তার ভাষায়, মৃত্যুর পর ব্যবস্থা নয়, মৃত্যুর আগেই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সময়ের আলো/জোই