দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যাংকিং নির্ভরতাহীন জনগোষ্ঠীর কাছে অতি সহজে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং। সহজ শর্তে টাকা জমা, উত্তোলন, তহবিল স্থানান্তর ও প্রবাসী আয় গ্রহণের সুযোগ থাকায় চালুর এক দশকের মধ্যেই দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সেবাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে প্রবৃদ্ধি ও প্রসারের সব সূচকে এগিয়ে রয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং।
এ সময় আমানত সংগ্রহ, সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ এবং নতুন হিসাব খোলার হার যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তেমনি প্রসার ঘটেছে সেবা প্রদানকারী এজেন্ট ও আউটলেটের। তবে উল্লিখিত তিন মাসে অন্যান্য সূচক ইতিবাচক থাকলেও এজেন্টের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জুন প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। এর আগের মার্চ প্রান্তিক শেষে এই আমানত ছিল ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৬৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
অর্জিত আমানতের খাতভিত্তিক চিত্রে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চল অনেক এগিয়ে রয়েছে। জুন শেষে সংগৃহীত মোট আমানতের মধ্যে গ্রামীণ এজেন্টদের অবদান ৪২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যেখানে শহরাঞ্চলের এজেন্টদের মাধ্যমে এসেছে ৯ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রায় ৩২ হাজার ৯৭৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বেশি আমানত গচ্ছিত রেখেছে।
আমানতের পাশাপাশি এই মাধ্যমে লেনদেনের পরিধিও অর্ধবার্ষিক প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিক অর্থাৎ মার্চ শেষে লেনদেনের এই অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ৬২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে লেনদেন বৃদ্ধির পরিমাণ ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের লেনদেনের চিত্রে দেখা যায়, জুন প্রান্তিকে শহরের এজেন্টগুলোতে ২৫ হাজার ৭৫৮ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হলেও গ্রামাঞ্চলের এজেন্টগুলোতে লেনদেনের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি ৪ লাখ টাকা। ফলশ্রুতিতে শহরের তুলনায় গ্রাম পর্যায়ে লেনদেন বেশি হয়েছে ৯৪ হাজার ৬৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
আর্থিক লেনদেন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গ্রাহক ভিত্তি ও অবকাঠামোগত বিস্তার। জুন প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় মোট হিসাবধারীর সংখ্যা ২ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৮১টিতে উন্নীত হয়েছে। মার্চ প্রান্তিকে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি।
এতে দেখা যায়, তিন মাসের ব্যবধানে নতুন গ্রাহক হিসাব খুলেছেন ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৮ জন। গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেড়েছে সেবার পরিধিও। মার্চে ব্যাংকগুলোর মোট এজেন্টের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৮৪টি থাকলেও জুনে তা ২৩৯টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪২৩টিতে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর আউটলেট সংখ্যা ২০ হাজার ৩৩৯টি থেকে ২৫৮টি বেড়ে জুন শেষে মোট ২০ হাজার ৫৯৭টিতে উন্নীত হয়েছে।
সূচকগুলোর এই ইতিবাচক ধারার বিপরীতে ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আহরণের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৫ হাজার ৯১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর আগের মার্চ প্রান্তিকে এজেন্টদের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সে হিসেবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কমেছে।
উল্লেখ্য ২০১৩ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় দেশে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ শুরু হয় এবং সে বছর ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এই সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। পরে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। কালক্রমে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক এই সেবায় যুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটি এখন দেশের প্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ, প্রবাসী আয় বিতরণ ও দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও