ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি স্টিল রি-রোলিং মিল। ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি কারখানাটিতে ৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এখন কাজ করছেন ১৫০ জন। কারখানার মালিক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ‘গত আট মাসে রডের বিক্রি ৫০ শতাংশ কমেছে। ব্যাংক থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে পণ্য তৈরি করে গুদামে রাখতে হচ্ছে। প্রতি মাসে সুদ গুনছি ২ কোটি টাকা। নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, এই কারখানা টিকিয়ে রাখাই দায়।’
আবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার একটি পোশাক কারখানা। ২০০ জন শ্রমিকের জন্য তৈরি, কাজ করছেন ৮০ জন। এর মালিক রাশেদুল করিম বললেন, ‘গত ছয় মাসে নতুন অর্ডার ৪০ শতাংশ কমেছে। ব্যাংক লোনের সুদ দিতে হচ্ছে ১৪.৫ শতাংশ। এই সুদে নতুন মেশিন কিনে পণ্য বানিয়ে লাভ করা সম্ভব না। তাই হাত গুটিয়ে বসে আছি।’
শুধু মোহাম্মদ আলী বা রাশেদুল করিম নন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গভীর মন্দা চলছে। বিক্রি কমেছে, অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে, আর নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি শুধু ব্যবসায়িক মন্দা নয়; বিনিয়োগের খরা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি অর্থবছরে তা কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এ হার কমপক্ষে ২৮ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
তলানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার এখন ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ২৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বিনিয়োগ প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জিডিপিতে প্রতি ১ শতাংশ বিনিয়োগ কমলে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়। সেই হিসাবে কয়েক বছরে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি।
বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী উৎপাদন খাতে গত এক বছরে ৮ লাখ ১২ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
বিডা সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) ৫০০ কোটি টাকার বেশি মাত্র দুটি নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে ৭০টিতেই এখনও উৎপাদন শুরু হয়নি।
ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগ কমার প্রধান কারণ আস্থার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ঋণের উচ্চ সুদহার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। এতে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে উঠেছে; এসএমই খাতে তা ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশে ১৫ শতাংশ সুদে নিয়ে শিল্প হয় না। আমরা হিসাব করে দেখেছি, ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কারখানা করলে পাঁচ বছরে সুদই হবে মূল টাকার সমান। তাই সবাই বিনিয়োগ থেকে সরে আসছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকে অলস তারল্য ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থ থাকলেও উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে।
ডলার সংকট ও এলসি জটিলতাও বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দাম ১২২ টাকা হলেও খোলাবাজারে তা ১২৪-১২৫ টাকা। এলসি খোলার ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ২৮ শতাংশ।
বিক্রি কমে উৎপাদনেও ধস : গত ১৮ মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বড় কোম্পানিগুলোর বিক্রিও কমেছে। নারায়ণগঞ্জের বিসিকের এক পোশাক কারখানার মালিক জানান, মাসে এক লাখ পিস শার্ট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও এখন অর্ডার পাচ্ছেন ৪০ হাজার পিসের। শ্রমিক ছাঁটাই করতে না পারায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।
গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তাও শিল্পে সংকট বাড়াচ্ছে। গাজীপুরের এক টেক্সটাইল মালিক বলেন, সকালে গ্যাস থাকলেও দুপুরে থাকে না। জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে অর্ডার নিয়ে যাচ্ছেন। নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ছয় মাস থেকে এক বছর লাগছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হবে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না, কর্মসংস্থান না হলে দারিদ্র্য বাড়বে। সরকারকে এখনই বিনিয়োগবান্ধব বার্তা দিতে হবে। কেন না দেশে নতুন বিনিয়োগ যেকোনো মূল্যে বাড়াতেই হবে। তা না হলে অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। নতুন সরকার হয়তো নানা রকম উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করা এবং নতুন বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছে, কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না। অর্থনীতির স্বার্থে এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রা স্বস্তির করতে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’
আবাসনেও চরম মন্দা : রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে। ঢাকায় প্রায় ৩০ হাজার এবং চট্টগ্রামে আরও ৮ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রীত পড়ে আছে। এ খাতের সঙ্গে যুক্ত রড, সিমেন্ট, টাইলস, ইট ও বালুসহ ২৫০টি লিংকেজ শিল্পও সংকটে পড়েছে।
গত দুই বছরে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ৬০ গ্রেড রডের দাম প্রতি টন ৭২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৯৬-৯৮ হাজার টাকা, সিমেন্টের দাম প্রতি ব্যাগ ৪৮০ থেকে ৬২০ টাকা এবং ইটের দাম প্রতি হাজার ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। পাথর ও বালুর দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
একজন ডেভেলপার জানান, ২০২২ সালে মিরপুরে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট নির্মাণে খরচ হতো ৩৫ লাখ টাকা; এখন তা বেড়ে ৫২ লাখ টাকা হয়েছে। ফলে ৬০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটের দাম এখন ৮৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। উচ্চ সুদের কারণে মধ্যবিত্তের জন্য এ ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে হোম লোন বিতরণ কমেছে ৪৫ শতাংশ।
রড-সিমেন্টেও উৎপাদন কমেছে : গাজীপুরের একটি রি-রোলিং মিলের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, তার তিনটি ফার্নেসের মধ্যে দুটি বন্ধ। আগে দিনে ১০০ টন রড উৎপাদন করলেও এখন করছেন ৩০ টন। প্রতি টনে প্রায় ৩ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। দেশে ৭০টি রড কারখানা ও ৩৫টি সিমেন্ট কারখানার প্রায় একই অবস্থা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শপিংমলেও ক্রেতার সংকট : ঈদুল আজহার পর শপিংমলগুলোতে কেনাবেচা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের এক দোকানি জানান, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে, যেখানে দৈনিক দোকান ভাড়াই ৪ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের আয়ের বড় অংশ খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই চলে যাচ্ছে। ফলে পোশাক, জুতা ও কসমেটিকসের মতো পণ্যের চাহিদা কমেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় কর্মচারী ছাঁটাইও শুরু হয়েছে। ঢাকায় প্রায় ৫০ হাজার শপিংমল কর্মচারী বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই এখন চরম মন্দাভাব চলছে। এই মন্দা বিগত কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। সবাই আশায় ছিল একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হবে-বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। বাস্তবতা হলো— এখনও সে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। উদ্যোক্তারা এখনও হাত গুটিয়ে রেখেছেন। তারা মনে করছেন দেশে এখনও বিনিয়োগের মতো স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়নি।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে