ভারতের শীর্ষ বণিকরা ঢাকায়, নজর কোনদিকে

এসএম আলমগীর

জাতীয়

জুলাই বিপ্লবের পর থেকে গত দুই বছর ধরেই টানাপোড়েন চলছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে। এই টানাপোড়েনে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন ভাটা পড়েছে,

2026-08-18T00:56:23+00:00
2026-08-18T00:56:23+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
ভারতের শীর্ষ বণিকরা ঢাকায়, নজর কোনদিকে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৬ এএম 
ছবি : সময়ের আলো গ্রাফিক
জুলাই বিপ্লবের পর থেকে গত দুই বছর ধরেই টানাপোড়েন চলছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে। এই টানাপোড়েনে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন ভাটা পড়েছে, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও দূরত্ব বেড়েছে। তাই এই সময়ে দুই দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যেমন দ্বিপক্ষীয় সফর হয়নি, তেমনি শীর্ষ ব্যবসায়ী পর্যায়েও সফর বন্ধ ছিল। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার ছয় মাস পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আলোচনা চলছে, যদিও এ সফর নিয়ে এখনও দোলাচল আছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আলোচনার মধ্যেই ভারতের সবচেয়ে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল এসেছে ঢাকা সফরে। ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) ১৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দুদিনের সফরে গতকাল সোমবার ঢাকায় এসেছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে ভারতের ব্যবসায়ীদের সফরে আলোচনায় শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থ নয়, আছে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। জানা গেছে, ভারতের ব্যবসায়ী নেতাদের নজর শুধু ব্যবসার দিকেই নয়, নজর থাকবে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকেও।

এদিকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারাও মনে করছেন ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ঢাকা সফর ঢাকা-দিল্লির রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে। এ ছাড়া তাদের এই সফরের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও গতি আসবে। শুধু তাই নয়, শুল্ক-অশুল্ক বাধা যেমন দূর হতে পারে, তেমনি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের যে প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে সোমবার তাদের সঙ্গে আমরা মঙ্গলবার (আজ) বৈঠকে বসব। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কীভাবে বাড়ানো যায় সেটিই থাকবে আমাদের মূল আলোচনার বিষয়। ভারত আমাদের সবচেয়ে নিকটতম ও বৃহত্তম প্রতিবেশী বাজার। দেশটিতে আমাদের রফতানি অনেক কম, তাই আমাদের পণ্য যাতে আরও বেশি রফতানি করা যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেব আমরা। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাধাগুলোসহ শুল্ক-অশুল্ক বাধা কীভাবে দূর করা যায় সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করব। এ ছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ী পর্যায়ে যাতে সম্পর্ক ভালো থাকে সে বিষয়েও আমরা জোর দেব।’

ফজলুল হক আরও বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আলোচনা চলছে। যদিও এই সফর হবে কি না সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। এই অবস্থার মধ্যে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসা দুই দেশের জন্য ইতিবাচক দিক। গত দুই বছর ধরেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক একটা দূরত্ব চলছে। ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল আমাদের দেশে আসা মানে অবশ্যই রাজনৈতিক দূরত্ব কমাতেও সহায়তা করবে। আমরা ব্যবসায়ীরাও ভারতের ব্যবসায়ীদের এ সফরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই।’


ঢাকায় দুদিনের সফরে আসা ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির ১৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি মঙ্গলবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং শিল্প সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখাই এ সফরের প্রধান লক্ষ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে বিকাল ৫টায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবে তারা। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এফবিসিসিআই এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও তাদের বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রতিনিধি দলে সিআইআইয়ের প্রেসিডেন্ট ডিজাইনেট এবং ভারত বায়োটেকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. সুচিত্রা কে ইলা, ইনফ্রাভিশন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিনায়ক চ্যাটার্জি, গডরেজ ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট রাকেশ স্বামী, আর্ভিন্দ লিমিটেডের সিইও ড. পরম শাহ, মাহিন্দ্রা গ্রুপের রিজিওনাল হেড রাজেশ গুপ্ত, গডরেজ কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান কৃষ্ণা খাতওয়ানি, মাহিন্দ্রা গ্রুপ বাংলাদেশের সিইও চৈতন্য কাগালকার, লারসেন অ্যান্ড টুবরোর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর সুব্রত দত্ত গুপ্ত, ফোর্বস মার্শালের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম প্রধান দীপক শর্মা, নুমালিগড় রিফাইনারির প্রধান মহাব্যবস্থাপক জ্যোতি ভূষণ শর্মা, বেক্সিমকো আইওসি পেট্রোলিয়ামের সিইও দেবরাজ দত্ত এবং অ্যাপোলো হসপিটালসের আন্তর্জাতিক বিপণন প্রধান এমএস গুরু প্রসাদ রয়েছেন।

এ ছাড়া সিআইআইয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মানিশ মোহন, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অমিত কুমার, মহাব্যবস্থাপক অনিল কুমার এবং নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্ধার্থ জে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রয়েছেন।

এই প্রতিনিধি দলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করার সম্ভাবনা আছে। আজ মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হবে। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা থাকবেন। একই সঙ্গে আজ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বৈঠকের কথা আছে।

এই প্রতিনিধি দল এমন একসময়ে বাংলাদেশ সফর করছে, যখন দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। সমুদ্র ও স্থলবন্দর ব্যবহারে ভারতের বিধিনিষেধের কারণে বাণিজ্য বিঘ্নিত হচ্ছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি আছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে বেশি, আর ভারতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

ব্যবসায়ী মহলের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এটিই বাংলাদেশ সফরকারী প্রথম বড় ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। এমন সময়ে এ সফর হচ্ছে, যখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিভিন্ন নীতিগত ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে এই সফরকে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সফরকালে বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা আশা করছেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতার পথ আরও সুগম হবে।

এ বিষয়ে আরেক ব্যবসায়ী নেতা ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ও ভারত-বাংলাদেশ চেম্বারের সাবেক সভাপতি তাসকিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘ভারত আমাদের সবচেয়ে নিকটতম ও বন্ধুপ্রতিম বাণিজ্যিক পার্টনার। এই দেশটি থেকে আমরা যতটা সহজে এবং কম দামে ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচসহ অনেক কৃষিপণ্য যেমন আমদানি করতে পারি, তেমনি শিল্পের কাঁচামাল-মেশিনারিজও সহজে আনতে পারি। তাদের মাটি-আবহাওয়া আর আমাদের মাটি-আবহাওয়া প্রায় একই রকম। এ জন্য আমরা চাই ভারতের সঙ্গে সবসময় সুসম্পর্ক বজায় থাক। যদিও ভারতের সঙ্গে একটা সময় ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ছিল, সেটি এখন ১২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তাই ভারতের জন্য বাংলাদেশের বাজার যেমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আমাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ভারতের ব্যবসায়ীদের এই সফরকে শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে চাই, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সেকেন্ড লার্জেস্ট ব্যবসায়ী পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়ী আলাপ হতেই পারে। তার আলোকেই ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে হয়তো রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কিন্তু দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন একটা প্রভাব পড়েনি; বরং এই সময় ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য আরও বেড়েছে। জিও-পলিটিক্যাল ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে হয়তো দূরত্ব বেড়েছে। তাই ভারতের এই ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সফর আমি শুধু ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে চাই। আমাদের জন্য ভারতের বাজার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও বাংলাদেশের বাজার গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারতের ব্যবসায়ীদের এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

সময়ের আল/টিকে


  বিষয়:   ভারত  বণিক  ঢাকা  নজর  বাংলাদেশ-ভারত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: