শাস্তির আতঙ্ক পদোন্নতির হাহাকার

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

পুলিশ বাহিনীতে কেউ আছেন শাস্তি, বদলি, বরখাস্ত ও অবসর আতঙ্কে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পদবঞ্চিতরা আছেন পদোন্নতির অপেক্ষায়। গত দুই বছর ধরে

2026-08-18T01:46:35+00:00
2026-08-18T01:47:52+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
শাস্তির আতঙ্ক পদোন্নতির হাহাকার
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪৬ এএম  আপডেট: ১৮.০৮.২০২৬ ১:৪৭ এএম
বাংলাদেশ পুলিশ । ছবি : সময়ের আলো গ্রাফিক
পুলিশ বাহিনীতে কেউ আছেন শাস্তি, বদলি, বরখাস্ত ও অবসর আতঙ্কে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পদবঞ্চিতরা আছেন পদোন্নতির অপেক্ষায়। গত দুই বছর ধরে পুলিশের শীর্ষ পদে চলছে টানাপোড়েন। কাউকে পাঠানো হচ্ছে বাধ্যতামূলক অবসরে। কেউবা হচ্ছেন বরখাস্ত। অনেকেই আছেন পলাতক। সেই সঙ্গে বাহিনী পুনর্গঠন করতে ব্যাপকহারে করা হচ্ছে রদবদল। আবার পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন বিগত সময়ে বঞ্চিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। অনেকে চুপিসারে দেশ ত্যাগ করে। কাউকে করা হয় গ্রেফতার। বারবার নোটিস দেওয়ার পরও অনেকে যোগ দেয়নি বাহিনীতে। অনেকে ৫ আগস্টের আগেই দেশ ছেড়ে চলে যান। পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হওয়ার চেষ্টা করছেন। পলাতক অনেকের বিরুদ্ধে বিদেশে বসেই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আছে।

৫ আগস্টের পর নিরাপত্তার স্বার্থে সেনানিবাসে আশ্রয় নেন ৫১৫ জন পুলিশ সদস্য-কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮৭ জন সদস্য এখনও কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। তবে এর বাইরেও অনেক পুলিশ সদস্য নানা কৌশল বা কারণ দেখিয়ে কর্মস্থলে এখনও অনুপস্থিত।

গণঅভ্যুত্থানের পর বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে নেওয়া সেই ধারাবাহিকতা বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের সময়েও অব্যাহত।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রায় ২০০ পুলিশ সদস্যের। চাকরি থেকে বরখাস্তু করা হয় অনেককে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে অসদাচরণ, জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা, আওয়ামী  লীগের প্রতি আনুগত্য, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অনিয়মে সহযোগিতা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেশ কিছু জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।

বাধ্যতামূলক অবসর : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জেলার এসপির দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। 

বাকিদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আবার রাতের ভোটের সময় জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজনকে কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। 

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তালিকায় আরও পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। এ তালিকায় পুলিশ পরিদর্শক থেকে শুরু করে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পলাতক ও বরখাস্ত : পলাতক পুলিশ সদস্যদের তালিকায় শীর্ষে আছেন ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর-রশীদ, যার নামে ৩৮টি মামলা রয়েছে। আরও রয়েছেন অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, খন্দকার নুরুন্নবী, এস এম মেহেদী হাসান, সঞ্জিত কুমার রায় ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী; যাদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর একাধিক মামলা করা হয়।

গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক থাকা ১৮৭ জন পুলিশ সদস্যের বেতন বন্ধ করে দেয় পুলিশ সদর দফতর। তাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নিতে মামলা হয়। এমনকি তাদের গ্রেফতারে আলাদা টিমও গঠন করে পুলিশ। তারা যেন বিদেশে পালাতে না পারেন সে জন্য বাতিল হচ্ছে তাদের অফিসিয়াল পাসপোর্ট।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী সাইফুল ইসলাম গত ৯ জুলাই বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের অন্তত ৮২ জন ক্যাডার কর্মকর্তা পলাতক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বরখাস্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে ৫৭ জনের তালিকা। এর মধ্যে তিনজনকে বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে বরখাস্ত করা হবে।

কারাগারে যারা : গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলির ঘটনায় পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন মামলা হচ্ছে। এসব মামলায় পুলিশের সাবেক দুই মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং এ কে এম শহীদুল হক, অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমান, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহিল কাফী ও যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আবুল হাসানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচিত অন্তত সাত সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।


কাজে যোগ দেননি যারা : কাজে যোগ না দেওয়া শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান (স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসরের আবেদন করেছেন), ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, ডিবির সাবেক যুগ্ম কমিশনার খোন্দকার নুরুন্নবী ও সঞ্জিত কুমার রায়, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান, রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার উত্তম কুমার পাল এবং পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার।

আত্মগোপনে থেকে অবসরে : ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, অপরাধী তদন্ত বিভাগের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামানসহ শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ২৩ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। অবসরে যাওয়ার আগে তাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে ছিলেন।
পদোন্নতি : আওয়ামী লীগের সময়ে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন অনেক পুলিশ সদস্য। গণঅভ্যুত্থানে দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে আশার সঞ্চার হয় পদবঞ্চিতদের মধ্যে। সেই হিসেবে তালিকাও করা হয়। কিন্তু এখনও মেলেনি কাক্সিক্ষত পদোন্নতি।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো কঠিন কাজ করার পরও প্রত্যাশিত ও প্রাপ্য পদোন্নতি না পেলে তা কর্মস্পৃহায় স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়ে। অনেকেরই চাকরির বয়সসীমা শেষ পর্যায়ে। তাই প্রাপ্য পদোন্নতি চাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে যারা বিগত ১৫ বছর ধরে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বীকার করেছেন, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিগত ১৫ বছরে পুলিশের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পদোন্নতি হয়েছে। দলীয় পরিচয়ে পদোন্নতি হয়েছে এ সংখ্যাও প্রায় ২০ শতাংশ। বাকিদের পদোন্নতি যোগ্যতার ভিত্তিতেই হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টসহ সব ধরনের নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় আটকে আছে পদোন্নতি প্রক্রিয়া।

বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের নিয়মিত ডিআইজি পদের সংখ্যা ৮৭। কর্মরত আছেন ৮২ জন। অর্থাৎ পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। পুলিশের বিসিএস ২০ ব্যাচের বেশ কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।

অন্যদিকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে গ্রেড-২-এর ২০টি এবং গ্রেড-১-এর দুটি পদসহ মোট ২২টি পদ রয়েছে। এখানেও পাঁচটি পদ খালি রয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে পাঁচটি সুপারনিউমারারি পদ রয়েছে। পুলিশের বিসিএস ১৭ ও ১৮ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে।

৫ আগস্টের পর থেকে অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজিসহ বিভিন্ন পদে প্রায় দুইশ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর পর পদোন্নতি প্রত্যাশীদের তুলনায় অপ্রতুল। এর অন্যতম কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নিয়মিত পদের বিপরীতে অধিকসংখ্যক সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে পদোন্নতির আলোচনায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনগুলো।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ছড়ানো ‘মিথ্যা, মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অপতথ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি কনস্টেবল থেকে ডিআইজি পর্যন্ত পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্যদের পদোন্নতি ও পদায়ন সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। এসব সমস্যা নিরসনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   শাস্তি  আতঙ্ক  পদোন্নতি  হাহাকার  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: