ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রয়টার্স ও ইপসোসের নতুন জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমে ৩৩ শতাংশে নেমে গেছে। এটি তার বর্তমান মেয়াদে সর্বনিম্ন। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের মধ্যে এমন আশঙ্কার কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এমন পতন ঘটেছে।
চার দিনব্যাপী এই জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তারা হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট, যেখানে ৬৪ শতাংশই তার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের সমর্থনের হার, যা চলতি মাসের শুরুর দিকের জরিপে ৩৫ শতাংশ ছিল। সেটিই নতুন জরিপের আগে তার বর্তমান মেয়াদের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম ছিল। নতুন জরিপে জনপ্রিয়তার হার এখন তার আগের মেয়াদের ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পৌঁছানো সর্বনিম্ন স্তরের সমান হয়েছে।
৪৮ শতাংশেরও কম মানুষের সমর্থনে ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর, চলতি বছরে মার্কিন মিত্র ইসরাইলের পাশাপাশি ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর তার জনপ্রিয়তায় ধস নামে। এই সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। বিশ্বে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। এতে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টায় থাকা ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিও চাপে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালানো ট্রাম্প শুরুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু ইরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে এবং সংঘাত শিথিল হওয়া সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন অনেকটাই বন্ধ করে রেখেছে।
রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ আমেরিকান যার মধ্যে ৮৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৭১ শতাংশ রিপাবলিকান; মনে করেন যে ইরানে মার্কিন অংশগ্রহণ ‘দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।’ মাত্র ১৬ শতাংশ বলেছেন যে এই সংঘাত সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে।
সংঘাতজুড়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনো উত্তেজনা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো বলেছেন, শান্তিচুক্তি শিগগিরই হতে যাচ্ছে। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচজন মার্কিনির মধ্যে একজন এবং মাত্র অর্ধেক রিপাবলিকান মনে করেন, এই যুদ্ধের মূল্য দেওয়া সার্থক হয়েছে।
যুদ্ধ এবং পেট্রোলের দাম নিয়ে উদ্বেগ রিপাবলিকানদের মধ্যে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার আশা নিয়েই তারা উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ক্রমেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের নিয়ন্ত্রণও তাদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। চলতি মাসে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপগুলোতে দেখা গেছে, প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভোটাররা অর্থনীতি পরিচালনায় রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের বেশি যোগ্য মনে করছেন।
সর্বশেষ জরিপে ৩৮ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা অর্থনীতি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। বিপরীতে ৩৫ শতাংশ রিপাবলিকানদের পদ্ধতিকে বেশি পছন্দ করেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও ডেমোক্র্যাটদের বেশি সক্ষম বলে মনে করছেন ভোটাররা। ট্রাম্পের মেয়াদজুড়েই অভিবাসন নীতিতে রিপাবলিকানদের পদ্ধতি ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় বেশি জনপ্রিয় ছিল। এর পেছনে রয়েছে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের নির্দেশে দেশজুড়ে অব্যাহত কঠোর অভিযান। তবে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ এবং শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করে আটক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে রিপাবলিকানরা জনসমর্থন হারাচ্ছেন।
সর্বশেষ রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন, অভিবাসন নীতিতে রিপাবলিকানদের পদ্ধতি ভালো। বিপরীতে ৩৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন। দুই শতাংশ পয়েন্টের এই ব্যবধান ট্রাম্পের পুরো মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রিপাবলিকানরা ২৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিল।
অনলাইনে পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোসের এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এক হাজার ১৬৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। জরিপটির ফলাফলে উভয় দিকে ভুলের সম্ভাব্য সীমা তিন শতাংশ পয়েন্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি