পদ্মা ও যমুনায় প্রকাশ্যেই চলছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো লোমহর্ষক কর্মকাণ্ড। সর্বহারা লাল পতাকা বাহিনীর কথিত সদস্য পরিচয়ে প্রতিদিন হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে নৌযান মালিক, চালকসহ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেটে খাওয়া শ্রমিকের লাখ লাখ টাকা।
মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা ও যমুনা নদীর পাটুরিয়া, আরিচা এবং হরিরামপুর পয়েন্টে চলাচলরত বালুবাহী বাল্কহেডকে টার্গেট করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এমন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নৌযান শ্রমিকরা বলছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের প্রায় ৫০ জন অস্ত্রধারী সদস্য দিনে ও রাতে সমানতালে ১০ থেকে ১২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে নৌ চ্যানেল চার্জের কথিত সাইনবোর্ড লাগিয়ে বালুবাহী বাল্কহেডসহ সব ধরনের নৌযান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লুট করছে। তাদের নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র, ইজারা নীতি, সীমানা নির্ধারণ কিংবা অর্থ আদায়ের বৈধতা।
শুধু অস্ত্রের মুখে নৌযান শ্রমিকদের জিম্মি করে নিজেদের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা ধরনের কর্মসূচিও পালন করেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও কোনো এক অজানা কারণে এখন পর্যন্ত অস্ত্র ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি সর্বহারা লাল পতাকা বাহিনীর কথিত নামধারী সদস্য। তারা নানা অপকর্ম করে নদীতে গিয়ে নৌকায় ভাসমান বসতি তৈরি করেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো লুটের টাকায় তারা প্রায় প্রত্যেকেই বনে গেছে কোটিপতি। তারা প্রত্যেকেই হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তাদের অত্যাচার ও নির্যাতনে একসময়ের নিরাপদ নৌপথ এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
মাঝেমধ্যেই তাদের গুলিতে নৌ শ্রমিক মারা যাচ্ছে। বেশ কিছু দিন আগে তেওতা বালুমহালের ম্যানেজার তাদের চাঁদা নেওয়ার কাজে বাধা সৃষ্টি করলে তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় মামলা হলেও আজ অবধি কেউ গ্রেফতার হয়নি। অদৃশ্য কারণে পুলিশ কাউকে ধরার চেষ্টাও করেনি।
নৌযান শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ, কথিত রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রশানের অসাধু ব্যক্তিরা। তাদের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক মাসোহারা দিয়ে চলে এমন অপকর্ম। দৌলতদিয়া থেকে পাকশি পর্যন্ত সরকারি গেজেটভুক্ত একটি বৈধ চ্যানেল রয়েছে। এই চ্যানেল দিয়ে চলাচলকারী নৌযানকে চ্যানেল চার্জ দিতে হয়।
উল্লেখিত চ্যানেলের আওতামুক্ত নৌপথে চলাচলের জন্য কোনো নৌযানকে কখনোই কোনো চার্জ বা টাকা দিতে হয়নি। এর বাইরে যমুনা ও হরিরামপুরে নতুন করে গেজেটভুক্ত কোনো চ্যানেল দেওয়া হয়েছে কি না সে ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য সূত্র বা বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য জানায়নি। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র চ্যানেল চার্জের নামে পুরো নদী দখল করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি করছে।
নৌযান শ্রমিক, চালক ও মালিকরা বলছেন, চলন্ত পথে নৌযান থেকে কোনো অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। তারপরও তারা প্রতিটি নৌযান থেকে অবৈধভাবে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। চাঁদার টাকা না দিলে অস্ত্র ঠেকিয়ে নৌযানে যা পাচ্ছে তাই লুটে নিয়ে যাচ্ছে। করছে গালাগালি ও মারধর। তারা প্রাণের ভয়ে লুটেরাদের কিছু বলতে পারেন না। তাদের দাবি, এই ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ জড়িত আছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিষয়টা বারবার অবগত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিআইডব্লিউটিএ।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অঞ্চলের পোর্ট অফিসার সুব্রত রায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নৌপথে কোনো চাঁদাবাজি হচ্ছে না। ওরা নিয়ম অনুসারে চ্যানেল চার্জ আদায় করছে।
তিনি আরও বলেন, ইজারার বাইরে যদি কেউ অবৈধভাবে টাকা আদায়, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতি করে তাদের বিরুদ্ধে নৌ পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। এর কোনো দায়ভার বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নেবে না। চ্যালেন চার্জ আদায়ের নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নির্ধারণ করা আছে কি না জানতে চাইলে আরেকটা কল এসেছে বলে ফোন কেটে দেন এই কর্মকর্তা। পরে আবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার বরিউল ইসলাম বলেন, নৌপথে চ্যানেল চার্জের নামে কেউ চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে সে যেই হোক না কেন তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নৌ পুলিশ কঠোর হাতে তা দমন করবে।
এদিকে নৌপথ নিরাপদ ও চাঁদাবাজমুক্ত রাখতে নৌযান শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে