ধান নিয়ে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার ধানাইপানাই

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

সারাদেশ

চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে ধান নিয়ে ধানাইপানাই করাসহ ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের

2026-08-24T20:49:00+00:00
2026-08-24T20:49:00+00:00
 
  সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬,
৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
ধান নিয়ে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার ধানাইপানাই
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৪৯ পিএম 
ইনসেটে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়। ছবি: সংগৃহীত
চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে ধান নিয়ে ধানাইপানাই করাসহ ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে। লটারিতে নাম উঠলেও গোডাউনে ধান দিতে না পারা, তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, আবার নাম ঠিক থাকলেও মোবাইল নাম্বার ভিন্ন, কৃষকদের হয়রানি, উৎকচ চাওয়া, এক শতক জমি নেই বা কৃষির সঙ্গে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের নাম, সিন্ডিকেটের সদস্যরা কৃষকের নাম ভাগবাটোয়ার করে নেওয়াসহ হেন কোনো অভিযোগ নেই যা উঠেনি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে সবকিছু জেনেও নীরব দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রৌমারী খাদ্যগুদামের কৃষকের তালিকায় ৩ শত ২২ জন নাম থাকার কথা থাকলেও ৩শ ২৩ জন কৃষকের নাম রয়েছে। চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় মোট ৯ শত ৬৬ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গত ২৪ মে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। সেই থেকে ধান ক্রয়ের ডিজিটালাইজড নিয়ম না মেনে, নতুন বস্তায় ধান সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও পুরাতন-জরাজীর্ণ বস্তায় করা হচ্ছে ধান সংগ্রহ।

খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে রয়েছে বন্ধের দিন ও রাতের আধারে ধান গুদামজাত করার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিক ম্যানেজ করার কথা বলে প্রতি ৩ মেট্রিক টন ধানের জন্য কৃষক প্রতি ৩ হাজার ৩০০ টাকা উৎকোচ নেওয়া, সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে একেক জনকে ২০-৩০ জনের বিল দেওয়ারও অভিযোগও আছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। 

উপজেলার বন্দবেড় গ্রামের মাহমুদুল বলেন, লটারির তালিকায় আমার নাম থাকার পরেও গুদাম খাদ্য কর্মকর্তা আমার ধান গ্রহণ করেননি এবং আমার বিল কে বা কারা উত্তোলন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সোমবার (২৪ আগস্ট) ওই খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা বলেন, আপনার বিলটি অন্য কেউ করেছে, আপনি ১৯ হাজার টাকা নিয়ে আপস হয়ে যান। এক পর্যায় আপস হতে বাধ্য করেন। 

উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের শান্তির গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, তালিকায় আমাদের নাম থাকার পরেও খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় আমাদের ধান নিতে রাজি হয়নি। পরে আমরা কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের সুপারিশ নিয়ে যাই। তাতেও কাজ হয়নি। পরে তিনি আমাদেরকে মণ প্রতি ১০০ টাকা দেওয়ার নিয়ে বিষয়টি সুরাহার প্রস্তাব করেন। আমরা তাতেও রাজি হয়নি।


একই গ্রামের বাসিন্দা আছুর উদ্দিন ও আজিজুল হকের অভিযোগ করে বললেন, আমাদের গ্রাম থেকে ফুড গোডাউন ২২ কিলোমিটার দূরত্বে এখন পর্যন্ত চার দিন গোডাউনে গিয়েছিলাম কিন্তু আমাদের ধান নেয়নি। পরে ১২ আগস্ট বিকেলে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় আমাদের ডেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে রফাদফা করে নেন।

কিন্তু ১২ আগস্ট খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় দুপুরে এ প্রতিনিধিকে বলেন, ধান গ্রহণ করা শেষ হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার দুপুরে বললেন ধান নেওয়া শেষ, বিকেলে কোন নিয়মে ওই তিন কৃষকের ধান গ্রহণ করলেন?

খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ধান গ্রহণের সময় শেষ হলেও এখনো কৃষক মানিক উল্লাহ, নছু শেখ, শিরিয়াসহ আরো অনেক কৃষকের ধান গ্রহণ না করে সিন্ডিকেট সদস্যদের বিল দিয়েছেন বলে জানা যায়। 

প্রতিবেদকের হাতে আসা ধান সংগ্রহের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চরশৌলামারী ইউনিয়নের সোলায়মান নামের কৃষকের মোবাইল নাম্বারে বন্দবেড় গ্রামের নান্নু মিয়ার মোবাইল নাম্বার। নান্নু মিয়া বলেন, আমিতে আবেদন করি নাই। আমার মোবাইল নাম্বার কে ব্যবহার করেছে তা আমার জানা নাই।

একইভাবে আব্দুল হামিদ, সোহেল রানা, জাহিদুল ইসলাম, খুকুমণি, আইয়ূব, জয়নাব বেগম, সাদাকাত, জুলফিকার,আলী হোসেন, নূর ছলিমা, শিরিয়া ও আছর উদ্দিনসহ আরও অনেকের নাম ঠিক থাকলেও ফোন নম্বর অন্য ব্যক্তির। প্রতিবেদক ফোন করে পরিচয় চাইলেও দিতে নারাজ তারা। 

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের খেতারচর গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান মনির জানালেন আরো গুরুতর অভিযোগ। তিনি জানালেন, রৌমারী উপজেলা খাদ্য গোডাউনে ধান ঢুকানোর জন্য প্রতি মণে আমার কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়েছে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়। 


অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় রৌমারী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের সঙ্গে। প্রথমে তিনি জানান, তার গোডাউনে ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে। তাহলে তালিকায় কৃষকের নাম থাকা স্বত্বেও অনেকে ধান দিতে পারেনি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে, তাদের ধান নেবো আমি। ভিন্ন নাম ও মোবাইল নম্বর প্রসঙ্গে তিনি উত্তর দেননি প্রতিবেদককে। তিনি শুধু বারবার এই প্রতিবেদককে বলতে থাকেন, কী তথ্য লাগে বলেন।

রৌমারী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে উৎকোচ নেওয়া, একজনের বিল অন্য জনকে দেওয়া ও কৃষক তালিকার নানা অসংগতির বিষয়ে কথা হয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ( ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হকের সাথে। তিনি বলেন, ঠিক আছে, বিষয়টি বুঝতে পেরেছি বলেই মোবাইল ফোনের কল কেটে দেন। 

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, রৌমারীর টিএনও আমার সামানেই আছে, হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করেন, বিষয়টি আমি দেখছি।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি, যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   ধান  খাদ্যগুদাম  কর্মকর্তা  ধানাইপানাই  সময়ের আলো  কুড়িগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: