বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে ২৪ জন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনুসন্ধানে এসব মন্ত্রী-এমপির দ্বৈত নাগরিকত্ব বা রেসিডেন্স কার্ড থাকার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হতে পারেন না। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতে একজন ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো রাষ্ট্রে রেসিডেন্স কার্ড বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার পরের ধাপে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গোপনে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বেলজিয়ামের রেসিডেন্স কার্ড (স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি) রয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী সাবেক পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব রয়েছে। তারা হলেন- আ হ ম মুস্তফা কামাল, মো. তাজুল ইসলাম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও মো. মাহবুব আলী।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বা গ্রিন কার্ড রয়েছে সাবেক চারজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ সাতজন সংসদ সদস্যের। তারা হলেন- আব্দুস শহীদ, নসরুল হামিদ বিপু, জুনাইদ আহমেদ পলক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আবদুস সোবহান মিয়া (গোলাপ), মাহফুজুর রহমান ও সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ। তাদের মধ্যে সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান এখন কারাগারে।
দুদকের অনুসন্ধানে কানাডার নাগরিকত্ব রয়েছে- এমন ছয়জনের মধ্যে একজন সাবেক মন্ত্রী, অন্যরা সাবেক সংসদ সদস্য। তারা হলেন- আবদুর রহমান, মাহবুব উল আলম হানিফ, আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (নাসিম), শামীম ওসমান, শফিকুল ইসলাম (শিমুল) ও হাবিব হাসান।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব রয়েছে। সাবেক রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের জাপানে থাকার অনুমতি (রেসিডেন্স কার্ড) রয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য (টাঙ্গাইল-২ আসন) তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনির জার্মানির নাগরিক। আর সাবেক সংসদ সদস্য (ময়মনসিংহ-১১) এম এ ওয়াহেদ পাপুয়া নিউগিনির নাগরিকত্ব নিয়েছেন।
সালমান এফ রহমানের সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব থাকলেও যুক্তরাজ্যে তার বাগানবাড়ি রয়েছে। সেখানে তার চারটি বাড়ি রয়েছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাতে ৬২০টি বাড়ি কিনেছেন। এসব বাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ৪৮ কোটি ডলার (প্রায় ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা)।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাড়ি রয়েছে লন্ডনে। তার এক মেয়ে আগে থেকেই লন্ডনে থাকেন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান কানাডার নাগরিক। দেশটির টরন্টো শহরে তার বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া দুবাইয়ের আজমান শহরে তার আরেকটি বাড়ি রয়েছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যুক্তরাজ্যের নাগরিক। সাবেক দুই প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও জুনাইদ আহমেদ পলকের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বৈধ অনুমতি বা গ্রিন কার্ড রয়েছে। নসরুল হামিদ ও তার ছেলের নামে দুবাইয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবদুস সোবহানের পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক ফ্ল্যাট বা বাড়ি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দুদক। ২০১৪ সালে প্রথম নিউইয়র্কে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা শুরু করেন গোলাপ। পরের পাঁচ বছরে তিনি নিউইয়র্কে একে একে ৯টি প্রপার্টি বা সম্পত্তির (ফ্ল্যাট বা বাড়ি) মালিক হন। এসব সম্পত্তির মূল্য ৪০ লাখ ডলারের বেশি, যা ডলারের বর্তমান বিনিময়মূল্য অনুযায়ী প্রায় ৪২ কোটি টাকা।
কানাডায় বাড়ি, ব্যবসাসহ বিপুল সম্পদ রয়েছে ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর (নাসিম)। তার মেয়ে কানাডায় থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি রয়েছে মানিকগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন মাহমুদ জাহিদের। তার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
নাটোরের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুলের বাড়ি রয়েছে কানাডার টরন্টোর নিকটবর্তী স্কারবরো শহরে। গত বছরের শুরুতে বাড়িটি কেনা হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি