দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সরাসরি জবাব না দিয়ে সংবাদকর্মীদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পাল্টাপ্রশ্নকে পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতার দৃষ্টান্ত মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) টিআইবির পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ সংবিধানসম্মত কি না, এ নিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অথচ এ বিষয়ে সাংবাদিকরা সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি জবাব না দিয়ে পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন।
টিআইবি মনে করে, জনস্বার্থে তথ্য জানতে চাওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ অসাংবিধানিক। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন, এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি তাই সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করে পদ গ্রহণ করায় প্রতিমন্ত্রী নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে সংবাদকর্মীরা যখন সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে ‘কে নিউজ করছে’ এবং ‘কার এত জ্বালা’— এ ধরনের পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন। তার মতে, এটি পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চারই প্রতিফলন।
‘সংবাদটি কে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, তা এখানে মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। এমন একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া তার দায়িত্ব।
সাংবাদিকদের প্রশ্নকে হুমকি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সুশাসনের প্রত্যাশায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি জবাব প্রত্যাশিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশের মাধ্যমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদনকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন উত্থাপনকারী সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক পাল্টাপ্রশ্ন করা একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়।
সংস্থাটির মতে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া শুধু সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে না, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ‘চিলিং ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে। ফলে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদকে কেন্দ্র করে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে তাদের ক্ষেত্রেও অবস্থান ও প্রামাণ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
সময়ের আলো/কেএইচও