কম দামের ইভি বন্ধে বাড়ছে প্রশ্ন

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

অর্থনীতি

একটি নতুন ইলেক্ট্রিক ভেহিকলের (ইভি) মান ভেদে দাম ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা। ঠিক একই মানের রিকন্ডিশন্ড (একবার ব্যবহৃত)

2026-08-28T01:07:08+00:00
2026-08-28T01:11:13+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
কম দামের ইভি বন্ধে বাড়ছে প্রশ্ন
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১:০৭ এএম  আপডেট: ২৮.০৮.২০২৬ ১:১১ এএম
ইলেক্ট্রিক ভেহিকল। ছবি : সংগৃহীত
একটি নতুন ইলেক্ট্রিক ভেহিকলের (ইভি) মান ভেদে দাম ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা। ঠিক একই মানের রিকন্ডিশন্ড (একবার ব্যবহৃত) ইভির দাম ৫০ লাখের কম। নতুন পুরোনো ইভির দামে পার্থক্য অর্ধেক। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অর্ধেকের কম। এতদিন ব্যবহৃত ইভি আমদানির অনুমতি ছিল। গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন আমদানি নীতি আদেশ জারি করে। এতে পুরোনো ইভি আমদানির অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষায় পুরোনো ইভি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গেল জুনে বাজেট পাসের পর বহু ইভি আমদানি করা হয়েছে। আমদানির জন্য ব্যাংকে ঋণপত্রও খোলা হয়েছে। অনেকে আমদানির প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। তারা সবাই পড়েছেন বিপাকে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যবসায়ীরা হতবাক। ইভি আমদানিতে উৎসাহী ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ।

গাড়ি ব্যবসায়ীদের মতে আমদানি নীতি আদেশে অনুমতি বাতিল করা মানে আমদানিতে কাস্টমসের নিষেধাজ্ঞা। এ কারণে আটকে গেছে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি। এসব ইভি আমদানিতে এখন ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) করা যাবে না। এমনিতে নতুন ইভির দাম অনেক বেশি। চড়া দামের কারণে দেশের গাড়ির বাজারে ইভির সংখ্যা খুবই কম। আমদানি এখনও তলানিতে।

আমদানিকরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছেন জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবহৃত ইভি আমদানি সহজ করতে। কিন্তু সহজ করার পরিবর্তে জারি হলো নিষেধাজ্ঞা। গেল জুনে বাজেট পাসের আগেই রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) এই প্রস্তাব করে। বাজেটে পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ রাখা হয়। স্বস্তি ফিরে আমদানিকারকদের মধ্যে। কিন্তু আমদানিতে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা জারি করায় হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ক্রেতাদের একটি অংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে আগ্রহী। বিশ্বব্যাপী চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ছে। চাহিদা সামনে রেখে জাপান এবং চীনে প্রচুর বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন হচ্ছে। দুই দেশের ইভির বাজার বাড়ছে দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা ও জার্মানির প্রতিষ্ঠানগুলোও পাল্লা দিয়ে তৈরি করছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। দেশে নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির অনুমোদন আছে। কিন্তু আমদানি খুবই কম। তাই দেশের সড়কগুলোতে খুব বেশি দেখা যায় না ইভি।


বৈদ্যুতিক গাড়িতে কোনো জ্বালানি তেল বা শক্তির ব্যবহার হয় না। তাই গাড়ি থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয় না। পরিবেশ রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধ এই গাড়িগুলোর ভূমিকা অনেক। ইভিতে ছোট আকারের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যাটারি আবার বেশি বিদ্যুৎ ধারণ করতে পারে। একবার চার্জে ২০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় মাত্র ২ থেকে ৪ টাকা। যা তেল বা সিএনজিচালিত যানবাহনের তুলনায় অনেক কম। তেল বা সিএনজি গাড়ির চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। ইঞ্জিনের বদলে মোটরের শক্তিতে গাড়ি চলে। এতে শব্দ কম হয় নিঃশব্দে পথ চলতে পারে। 

আমদানিকারকরা জানান, চীন এবং জাপান থেকেও প্রচুর ইভি রফতানি হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজার ধীরে ধীরে রিকন্ডিশন্ড ইভির দখলে চলে যাচ্ছে। জাপানের রিকন্ডিশন্ড ইভির গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, জর্জিয়া, সাইপ্রাস, কেনিয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, বারবাডোস, আয়ারল্যান্ড, পাকিস্তান। এর মধ্যে রাশিয়া ও নিউজিল্যান্ড জাপানি রিকন্ডিশন্ড ইভির বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে জাপানের মোট রফতানির ৬০ ভাগ রিকন্ডিশন্ড ইভি যায় রাশিয়া ও নিউজিল্যান্ডে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, জর্জিয়া, সাইপ্রাস, কেনিয়া, বারবাডোস, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো বেশি রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি করেছে। 

চীনের জিরো মাইলেজ ইভি রিকন্ডিশন্ড হিসেবে বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়েছে। চীনের রেজিস্ট্রেশন হলেও এসব ইভি মূলত চালানোই হয়নি। রিকন্ডিশন্ড ঘোষণার এসব ইভি প্রায় নতুনের মতো। এ ধরনের ইভি রাশিয়ার পাশাপাশি কাজাখাস্তান, কিরগিজস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়ায় রফতানি করা হয়। 

বিআরটিএর নিবন্ধন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দেশে ২০২১ সাল থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন শুরু হয়। ওই বছর মাত্র ছয়টি গাড়ির নিবন্ধন হয়েছিল। পরের বছর নয়টি গাড়ির নিবন্ধন হয়। এভাবে প্রতি বছর নামেমাত্র বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন হয়ে আসছে। কোন এক অর্থ বছরে ১০০ বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন এখনও হয়নি। অথচ এ সময় জাপানি টয়োটাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হাজার হাজার নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির নিবন্ধন হয়েছে। 

গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতি আদেশের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে যানবাহনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ‘পাঁচ বছরের অনধিক পুরাতন গাড়ি, মোটর কার, প্যাসেঞ্জার কার ও ট্রাক আমদানি করা যাইবে। তবে পুরাতন বা ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইলেক্ট্রিক ভেহিকল) আমদনি করা যাইবে না’। এই নীতি আদেশ প্রকাশের পর গাড়ি আমদানিকারকরা হতবাক। আমদানি নীতি আদেশ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


এ ব্যাপারে বারভিডার বর্তমান সভাপতি আবদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত ইভি আমদানি হচ্ছে। জাপানি ইভির চাহিদা বেশি থাকায় দেশে বহু ব্যবহৃত ইভি ইতিমধ্যে আমদানি হয়েছে। প্রায় এক কোটি টাকার একটি ব্রান্ডনিউ ইভি ৭/৮ বছরর ব্যবহৃত হলে অর্ধেকের কম ৪০ লাখ টাকায় কেনা যায়। কিন্তু গেল ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত আমদানি নীতি আদেশে সেই সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এতে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে। মানুষ সস্তায় পরিবেশবান্ধব ইভি কেনার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হবে। এই আদেশ বাতিলে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব। শিগগির আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হবে।

বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন সময়ের আলোকে বলেন, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ ৫ থেকে ১০ বছরের রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি করছে। তারা অনেক পরিবেশ সচেতন। কিন্তু আমাদের দেশে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি নিষিদ্ধ। ভাবতেই পারি না কাস্টমস কার স্বার্থে কেন এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। 

কেন এই নিষেধাজ্ঞা এ প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশে নতুন গাড়ি বাজারজাতকারী একটি গোষ্ঠী সক্রিয়। হয়তো তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত ইভি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। সাধারণ মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে পরিবেশবান্ধব ইভি ব্যবহারের সুযোগ আর থাকল না।

বারভিডার সহ-সভাপতি-২ ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ইভি আমদানির অনুমতিতো ছিল। গত বাজেটেও অনুমতি ছিল। বাজেটে অনুমতি বাতিলের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু ২৪ আগস্ট হঠাৎ আমদানি নীতি আদেশে তা বাতিল করা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকরা। পুরোনো ইভি উন্নত বিশ্বে ব্যবহার করতে পারলে আমরা কেন পারব না। বিষয়টি আমদানিকারকরা সরকারের কাছে বারবার তুলে ধরেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

পুরোনো ইভি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিনকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা


  বিষয়:   ইলেক্ট্রিক ভেহিকল  টেসলা  ইভি  অর্থনীতি  সময়ের আলো  আমদানি  নিষেধাজ্ঞা 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: