ঢাকা-দিল্লি যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে যে বৈরিতা চলছে, তাতে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেশী দুই দেশের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে দেখা হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জটগুলো সাফ করার সুযোগ মিলবে, যা দুই পক্ষেরই কাজে লাগানো প্রয়োজন। বৈরিতা জিইয়ে থাকলে যে অ্যামেরিকা এত দিন ভারতের লেন্স দিয়ে বাংলাদেশকে দেখত বলে মনে করা হতো, সেই অ্যামেরিকা এখন স্বতন্ত্রভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভাববে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রভূত প্রত্যক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন ও সম্পর্ক নিয়ে দৈনিক সময়ের আলোর কাছে বিশেষজ্ঞরা এভাবেই মন্তব্য প্রকাশ করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঢাকায় এক মিডিয়া সম্মেলনে জানান, বাংলাদেশি আদালতে সাজাপ্রাপ্ত এবং ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য পলাতক আসামিদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ এবং রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদির কথিত খুনিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হলে কেবল বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে যারা সরকারের সমর্থক এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন, তাদের অনেকে তারেক রহমানের ভারত সফরকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলেন। দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ দেখে, এমনকি সফর নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ইতিবাচক মন্তব্য শুনে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল, তারেক রহমান দিল্লি যাচ্ছেন। এ জন্য হঠাৎ করে বাংলাদেশের এমন স্পষ্ট কঠোর অবস্থানে রাজনৈতিক কৌতূহলী মহল বিস্মিত হয়েছেন। তবে মুখপাত্র যা বলেছেন, এক দিন আগে বিরোধী দলের চিফ হুইপ হুবহু একই দাবি জানিয়েছিলেন।
এতে মনে হয়, সরকার ভারত সফর নিয়ে বিরোধী দলকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগ দিতে চায়নি। একই কথা দিল্লিতে শেখ হাসিনার পাবলিক বক্তব্য নিয়ে সরকারের কঠোর প্রেস রিলিজ নিয়েও বলা যায়। দুটি ক্ষেত্রে সরকার যা বক্তব্য রেখেছে এবং যে প্রক্রিয়ায় রেখেছে, উভয়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে রেখেছে। কারণ, দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করে নিজস্ব অবস্থান মিডিয়ার মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের বৈরিতা প্রকাশ করে। সাধারণত যুদ্ধাবস্থায়, যখন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়, তখন এ ধরনের কৌশল নেওয়া হয়।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি মনে করি, ভারতের কাছে বার্তাটি খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের জনমনে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যেভাবে ভারতবিরোধিতা উসকে উঠেছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে আশ্রয় এবং দিল্লিতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য রাখা, পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে পুশইনের মতো কার্যক্রম চালু রাখা সেই ভারতবিরোধী মনোভাব বরং শক্ত করেছে।
ফলে বাংলাদেশের জনগণের কাছে কীভাবে সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে, তা ভারতকে পুনরায় ভাবতে হবে। অপরদিকে কঠোর অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে আপাতদৃষ্টিতে কিছু না পেলেও ভারতকে বাংলাদেশের ইস্যুগুলোর জরুরি ও গুরুত্ব বুঝতে বাধ্য করতে পারছে। একই সঙ্গে বিএনপি সরকার ভারতবিরোধিতার অজুহাতে সরকারবিরোধীদের কোনো রাজনৈতিক স্পেস দিচ্ছে না।
সম্পর্কে বৈরিতা জিইয়ে থাকলে ভারতের ক্ষতির বিষয়ে সাবেক মাহফুজুর রহমান বলেন, ভারত কি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক জিইয়ে রাখতে পারে? বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক ভারতের গ্লোবাল অ্যাম্বিশন ও ভাবমূর্তি বাধাগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশকে চীন, পাকিস্তান বা অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকে যেতে বাধ্য করবে।
যে আমেরিকা এত দিন ‘ভারতের লেন্স’ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখত বলে মনে করা হতো, সেই আমেরিকা এখন স্বতন্ত্রভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভাববে। আর ঢাকা যদি উপর্যুপরি দিল্লির সঙ্গে কথার যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তবে ভারতের মধ্যেও কেন্দ্রবিরোধিতা জোরদার হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে দিল্লির বিরোধ তৈরি হলে তাও জোরদার হতে উৎসাহিত হবে। আর ভারত যদি মনে করে, বিগত দিনে আওয়ামী শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক ছিল, তবে সে সুসম্পর্ক থেকে পাওয়া অর্জনও ক্রমান্বয়ে ধূলিসাৎ হবে। অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় কোনো অপরাধী বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে তার প্রত্যর্পণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের ক্ষতি সম্পর্কে এই কূটনীতিক বলেন, ঝুঁকি বাংলাদেশেরও আছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক ও গভীর। পারস্পরিক বৈরিতা বাংলাদেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ মুহূর্তে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বড় ইস্যু। এর বাইরে সীমান্ত উত্তেজনা, ইমিগ্রেশন ও ব্যবস্থাপনা; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট; চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন সম্পর্ক এবং চোরাচালান ও নিরাপত্তা ইস্যু রয়েছে।
সম্পর্ক বৈরী থাকা মানে এর সব কটি থমকে থাকবে, ক্রমান্বয়ে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে এবং ফলে বাংলাদেশ প্রভূত প্রত্যক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। দুই দেশের জনসংখ্যা ১৭০ কোটি। পারস্পরিক বৈরিতা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করবে। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে উভয় তরফে কূটনৈতিক পদ্ধতি শক্তিশালী করে বৈরিতা নিরসনের জন্য আশু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
আর এই উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো আমলে নেওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে পারে, এমন বক্তব্য না দিতে দুই দেশ সম্মত হতে পারে। ভারত সীমান্ত হত্যা ও পুশইন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে। একে অপরের মাটি ব্যবহার করে একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো ধরনের প্রচারণা বা কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, তার মানে কি এই যে আমি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে না যাওয়া সমর্থন করছি? না, সমর্থন করছি না। কূটনীতি অনেকভাবে করা যায়। আমি এক পা এগিয়ে কূটনীতি পরিচালনার পক্ষে। আমি বৈরী পক্ষের ভেতরে ঢুকে উষ্ণ পরিবেশ তৈরির পক্ষে। গোস্বা করলে, মনোমালিন্য জিইয়ে রাখলে, একগুঁয়েমি বহাল রাখলে, শর্ত দিলে কূটনীতির ক্ষেত্র কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে। আমি একঘরে হয়ে কূটনীতি করতে চাই না। বরং ‘সারা পৃথিবীকে আপন ঘর’ করতে চাই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই সম্পর্কে বৈরিতা থাকলে দুপক্ষেরই ক্ষতি। কিন্তু একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি ঢাকার ক্ষতির কথাই আগে বলব। কেননা, সম্পর্কে বৈরিতা জিইয়ে থাকলে ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের পেছনে লেগে থাকবে এবং ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। তখন বাংলাদেশকে সেটা সামাল দেওয়ার জন্য বাড়তি এফোর্ট দিতে হবে; কিন্তু এতে কি সুস্থ পরিবেশ বিরাজ করবে? বাংলাদেশ ছোট দেশ এবং আমাদের সক্ষমতা কম। ভারতের মতো বড় দেশের সঙ্গে আমরা পায়ে পা ঠেকিয়ে ঝগড়া করতে পারব না।
সম্পর্ক উন্নত করার জন্য এই সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, যা আমাদের কাজে লাগানো প্রয়োজন। প্রচুর লোক আছে, যারা চায় না যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখুক। যারা সুসম্পর্ক চায় না, তারা কেন চায় না এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সেগুলো আমাদের বুঝতে হবে।
দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। এমন বৈঠক হলে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমবে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ইস্যুতে আমি বলব যে, এমন সফরে আমাদের সব সমস্যা হয়তো সমাধান হবে না। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে যাওয়া উচিত।
আমাদের সম্পর্কে পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ভাগাভাগিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে, যা দুই দেশের নাগরিকদের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। দুই শীর্ষ নেতার দেখা হলে অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান হবে, যা এখন আলোচনাই করা যাচ্ছে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও