মানুষ সামাজিক জীব। ফলে সমাজে চলতে হলে মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসা ও লেনদেন করেই চলতে হয়। লেনদেনের মাধ্যমে জীবনযাপন করা ছাড়া ইবাদত-বন্দেগি পালনও সম্ভব নয়। তাই ইসলামে মুয়ামালাত ও লেনদেনের গুরুত্ব অনেক বেশি। লেনদেনের কিছু নিয়মও দিয়েছে ইসলাম। এসব মেনে চললে পৃথিবীতে তো মানুষ উপকার পাবেই, পরকালেও রয়েছে এর জন্য মহাপুরস্কার! পক্ষান্তরে লেনদেনে অস্বচ্ছতার কারণে দোয়া-ইবাদত কবুল হয় না।
রাসুল (সা.) একজন লোকের বর্ণনা দিলেন; যে দীর্ঘ পথ সফর করে এসেছে। চুলগুলো এলোমেলো, শরীর ধূলি-ধূসরিত। আসমানের দিকে হাত তুলে দোয়া করছে- হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য-পানীয় হারাম, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম; তা হলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে? (মুসলিম : ১০১৫; তিরমিজি : ২৯৮৯)
বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ অন্যের কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখে। আবার বিভিন্ন সময় নানা প্রয়োজনে আমরাও ঋণ-ধার করি। অথবা যে কোনোভাবে অপরের কোনো জিনিস আমাদের কাছে থাকে; এ অবস্থায় উচিত পাওনাদারের জিনিস বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। যে ব্যক্তি এ আমানতের খেয়ানত করবে তার ঈমান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে হাদিসে।
হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই। যার প্রতিশ্রুতির ঠিক নেই তার দ্বীন নেই’ (মুসনাদে আহমাদ : ১২৩৮৩)। অনুরূপভাবে যার উপার্জন বৈধ নয়, তার ইবাদতও কবুল হয় না। হাদিসে এসেছে, ‘ওজু ছাড়া নামাজ কবুল হয় না; আর আত্মসাতের (অর্থাৎ অবৈধভাবে উপার্জিত) সম্পদের সদকাও কবুল হয় না’। (মুসলিম : ২২৪)
মানুষের পাওনা হক আদায় না করার অনেক শাস্তি। রাসুল (সা.) একবার সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? তারা বললেন, যার অর্থ-সম্পদ নেই আমরা তো তাকেই নিঃস্ব মনে করি। তখন রাসুল (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কেয়ামতের ময়দানে নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি অনেক নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে হয়তো কাউকে গালি দিয়েছে বা কারও ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে বা কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বা কাউকে খুন করেছে অথবা কাউকে আঘাত করেছে। ফলে প্রত্যেককে তার হক অনুযায়ী এই ব্যক্তির নেক আমল থেকে দিয়ে দেওয়া হবে। যদি কারও হক বাকি থেকে যায়, আর এই ব্যক্তির নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তা হলে হকদার ব্যক্তির পাপ পাওনা অনুসারে এই ব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। ফলে সে এই পাপের বোঝা নিয়ে জাহান্নামে যাবে’। (মুসলিম : ২৫৮১; তিরমিজি : ২৪১৮)
সর্বোপরি লেনদেনে স্বচ্ছতা অবলম্বন করা জরুরি। হারাম সম্পদ জাহান্নামে জ্বলবে। হারাম সম্পদ দ্বারা পূর্ণ শরীর জান্নাতে যাবে না। বরং জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এমন শরীর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম সম্পদ দ্বারা বর্ধিত। জাহান্নামই তার উপযুক্ত স্থান’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৪৪৪১)। হাদিসে আরও এসেছে, রাসুল (সা.) হজরত কাব বিন উজরাহ (রা.)-কে ডেকে বললেন, হে কাব! শুনে রাখো, ওই দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম হতে সৃষ্ট। কেননা জাহান্নামের আগুনই তার অধিক উপযোগী’। (তিরমিজি : ৬১৪)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি