নেপাল দুর্যোগ থেকে শিক্ষা

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

ইসলাম

পাহাড়কে আমরা স্থিতির প্রতীক বলেই জানি। হাজার বছরের পুরোনো শিলা, আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চূড়া আর নিচে বয়ে চলা নদী—

2026-08-28T13:20:43+00:00
2026-08-28T13:20:43+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
নেপাল দুর্যোগ থেকে শিক্ষা
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১:২০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পাহাড়কে আমরা স্থিতির প্রতীক বলেই জানি। হাজার বছরের পুরোনো শিলা, আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চূড়া আর নিচে বয়ে চলা নদী— এসব দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন চিরকাল একই রকম থাকবে। কিন্তু প্রকৃতিরও এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন সে মানুষের সব ধারণা বদলে দেয়। তখন পাহাড়ও ভেঙে পড়ে, নদীও পথ বদলায়, আর মানুষ বুঝতে পারে— পৃথিবীতে তার অবস্থান যতটা শক্ত মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। ২৬ আগস্ট আগে নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস সেই কথাটিই আবার মনে করিয়ে দিল। একটানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ গ্রাস করল। পাহাড়ি সড়ক ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বহু এলাকা। নদী, ঘরবাড়ি, সেতু, যানবাহন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এই দুর্যোগে বহু মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কয়েক শতাধিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে কিংবা উত্তাল নদীর স্রোতে এখনও অনেক মানুষের খোঁজ চলছে। নিহতদের মধ্যে শুধু নেপালের নাগরিক নন, বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভ্রমণকারীরাও রয়েছেন।

বারবার একই প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে, মানুষ কি সত্যিই প্রকৃতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? উত্তরটি যতটা প্রযুক্তির, তার চেয়েও বেশি বিনয়ের। প্রকৃতির সামনে মানুষের অর্জন অনেক, কিন্তু সর্বশক্তি নয়। নেপালের খবর পড়তে পড়তে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের ছবিও। বর্ষা এলেই দেশের কোথাও না কোথাও নদী উপচে পড়ে। উত্তরাঞ্চলে বন্যা, উপকূলে জলোচ্ছ্বাস, পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ধস, রাজধানী ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। কখনো দীর্ঘ খরায় মাটি ফেটে চৌচির হয়, আবার কখনো অতিবৃষ্টিতে সেই জমিই পানির নিচে তলিয়ে যায়। গ্রীষ্মে তাপদাহে মানুষ হাঁসফাঁস করে, শীতে শৈত্যপ্রবাহে অসহায় মানুষের জীবন থমকে যায়। এর মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন— বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত নয়। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে শুধু ভবন নয়, আমাদের প্রস্তুতির অভাবও প্রকাশ পাবে। এসব ঘটনা আলাদা আলাদা নয়। এগুলো একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী দখল, পাহাড় কাটা, জলাধার ভরাট— সব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই অনেক সময় দুর্যোগকে আরও ভয়ংকর করে তুলি। প্রকৃতির একটি আঘাত তখন মানুষের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকগুণ বড় বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, একজন মুসলমান এসব ঘটনাকে কীভাবে দেখবে? কেউ বলেন, এগুলো নিছক প্রকৃতির নিয়ম। আবার কেউ কোনো দুর্যোগ ঘটলেই দ্রুত ঘোষণা দেন— এটি আল্লাহর গজব। ইসলাম এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিকেই সমর্থন করে না। কুরআন মানুষকে আতঙ্ক নয়, উপলব্ধি শেখায়; কুসংস্কার নয়, আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে’ (সুরা রুম : ৪১)। এই আয়াতের অর্থ এই নয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি বন্যা, ভূমিকম্প বা ঝড় কোনো নির্দিষ্ট জাতির ওপর আল্লাহর শাস্তি। সে ঘোষণা দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। ওহির যুগ শেষ হয়েছে। আল্লাহ যেসব জাতিকে শাস্তি দিয়েছিলেন, সে সংবাদ তিনি তাঁর নবীদের মাধ্যমে জানিয়েছেন। কিন্তু এই আয়াত আমাদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শেখায়— প্রতিটি বিপর্যয় মানুষের জন্য সতর্কবার্তা, আত্মসমালোচনার সুযোগ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধির সময়।


মানুষ যখন দেখে, কয়েক মিনিটের ভূমিকম্পে বহুতল ভবন ধসে পড়তে পারে, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে একটি শহর অচল হয়ে যেতে পারে কিংবা একটি পাহাড়ধসে শত শত পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, তখন সে নতুন করে উপলব্ধি করে— সভ্যতা যত উন্নতই হোক, মানুষ শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই মুখাপেক্ষী। এই উপলব্ধিই একজন মুমিনের হৃদয়ে ভয় নয়, দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। কারণ ইসলাম শুধু বিপদের ব্যাখ্যা দেয় না; বিপদের সময় মানুষের করণীয়ও শিখিয়ে দেয়। দুর্যোগের পর আমাদের সমাজে একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ লিখে বসেন, ‘এটি আল্লাহর গজব।’ আবার কেউ বলেন, ‘এসবের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই; সবই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম।’ দুই ধরনের বক্তব্যই বাস্তবতার একাংশকে ধারণ করে, পুরো সত্যকে নয়। ইসলামের শিক্ষা এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষকে সংযম, প্রজ্ঞা ও আত্মসমালোচনার পথ দেখায়।

কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প, বন্যা, ভূমিধস কিংবা ঝড়কে আল্লাহর চূড়ান্ত শাস্তি বলে ঘোষণা করার অধিকার আমাদের নেই। অতীতের যেসব জাতির ওপর আল্লাহর বিশেষ শাস্তি নেমে এসেছিল, সে সম্পর্কে ওহির মাধ্যমে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল। নবীজির পর ওহির সেই ধারা সমাপ্ত হয়েছে। তাই আজ কোনো বিপর্যয়কে নিশ্চিতভাবে ‘গজব’ বলে প্রচার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি আল্লাহর ইচ্ছা ও শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে সবকিছুকে কেবল প্রকৃতির একটি ঘটনামাত্র বলেও দায় শেষ করা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। কুরআন মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করার ভাষা শেখায় না; বরং নিজের ভেতরে তাকানোর শিক্ষা দেয়। প্রতিটি দুর্যোগ মানুষকে থামিয়ে দেয়, অহংকার ভেঙে দেয়, নিজের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং রবের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন সেই আয়াতেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বর্ষায় কয়েক ঘণ্টার প্রবল বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতি এক রাতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।

ইসলাম মানুষকে শুধু দোয়া করতে শেখায় না, দায়িত্ব পালনও শেখায়। নবীজি আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করতেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে কখনো অবহেলা করেননি। এক ব্যক্তি উট ছেড়ে রেখে বললেন, তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন। তখন নবীজি বললেন, ‘আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো’ (সুনান আত-তিরমিজি)। 

এই একটি শিক্ষার মধ্যেই দুর্যোগ মোকাবিলার গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সতর্কতা— এসব আল্লাহর ওপর ভরসার বিপরীত নয়; বরং প্রকৃত তাওয়াক্কুলেরই অংশ। ইসলামের শিক্ষা আমাদের শুধু আল্লাহর কাছে হাত তুলতে শেখায় না, বিপদে মানুষের হাত ধরতেও শেখায়। শুধু নিজের নিরাপত্তা নয়, প্রতিবেশীর নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   নেপাল  দুর্যোগ  শিক্ষা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: