আরবি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। বছর ঘুরে এই মাস হাজির হলে নানান আয়োজন চলে মুসলিম বিশ্বে! কিন্তু বছরের তৃতীয় মাসকে ঘিরে মুমিনের হৃদয়ে এতো আয়োজন কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের সেই সময়ে। জানতে হবে— সেদিন কী হয়েছিল? কেমন ছিল সে সময়ের পৃথিবী? কেমন ছিল সমাজ, কেমনই বা ছিল মানুষের জীবন?
প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। ঈসা (আ.) পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তারপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। কোনো নবীর আগমন ঘটেনি। আর নবী ছাড়া পৃথিবীর সময় যতই গড়িয়েছে, ধীরে ধীরে ততই মানুষের স্খলন ঘটেছে। এক সময় পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হত্যা, খুন-খারাবি, চুরি-ডাকাতি। মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যেতে থাকে ঈমানের আলো। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অজ্ঞতা আর মূর্খতা। মানুষ এতটাই নির্দয় হয়ে ওঠে যে, কন্যাসন্তানকে অশুভ ও অমঙ্গল মনে করে নিজের সন্তানকেই জীবন্ত কবর দিতে দ্বিধা করত না।
এই ছিল সে সময়ের পরিবেশ, সে সময়ের বাস্তবতা। যে সময়কে বলা হয় আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ।
গোটা পৃথিবী যখন গুনাহের অন্ধকারে দিশেহারা, মানুষ যখন পথ হারিয়ে আলোর বিপরীতে ছুটছে— তখন আল্লাহ তার অবুঝ বান্দাদের পথ দেখানোর ইচ্ছা করলেন। জাহান্নামের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে জান্নাতের পথে হাঁটানোর ব্যবস্থা করলেন। পাপের অমানিশা দূর করে মানুষকে আলোর সন্ধান দিতে চাইলেন।
যেমন ইচ্ছা, তেমনই ব্যবস্থা। ৫৮০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ। রবিউল আউয়াল মাস। সে সময়ের আকাশে-বাতাসে যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল অদৃশ্য এক আওয়াজ। একটি নাম। এমন এক নাম, যে নামের সঙ্গে আরবের মানুষ তখনো পরিচিত নয়।
কী সেই আওয়াজ? কোন সে নাম, যা মক্কার আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াত? কোন সে নাম, যা অদৃশ্য এক আকর্ষণে মক্কার মানুষকে উদগ্রীব করে তুলছিল? সে নাম—‘মুহাম্মদ’। হ্যাঁ, শেষ জামানার সর্বশেষ নবী, শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ সা.এর নাম। যে নূর ছিল বাবা আবদুল্লাহর কপালে, সেই নূর এবার আশ্রয় নিল মা আমেনার কোলে। ধীরে ধীরে মেস নূর ছড়িয়ে পড়ল দুনিয়ার মুমিনদের হৃদয়ে হৃদয়ে। ফলে প্রতি রবিউল আউয়াল মুমিন হৃদয়ে নূরে আলোয় উদ্ভাসিত হয়। নবী প্রেমে সিক্ত হয়ে ওঠে গুনাহে ডুবে থাকা অন্তর।
যে অহিবাহককে ঘিরে এতো আয়োজন, তার শিশুকাল মুমিন বান্দাদের অন্তরকে বিরহকাতর করে তোলে।
মুহাম্মদ সা. পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার বাবা আবদুল্লাহ আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। বুকের ভেতর সাগরের উচ্ছল ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে কষ্ট। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে? কিন্তু আমেনাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। তার নিজেকে শক্ত করতে হবে। বুকের ধন, কলিজার টুকরো মানিককে বুকে আগলে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হবে।
কিন্তু মায়ের ভালোবাসাও বেশিদিন কপালে স্থায়ী হলো না নবীর। তার বয়স যখন মাত্র ছয়, তখন মা আমেনাও আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। জন্মের আগেই বাবাকে হারালেন, জন্মের পর মাকেও। তখন একটি মাত্র প্রশ্ন হাজির হয়, এখন কী হবে শিশু মুহাম্মদের? কে করবে তার লালন-পালন? কে আগলে রাখবে এই এতিম শিশুকে?
খোদার সিদ্ধান্ত! তিনি শিশু থেকে মরুর বিশ্বাসী বালকে পরিণত হলেন। এরও পরে পেলেন খোদার নেয়ামত, তিনি নবুয়াতপ্রাপ্ত হলেন। দুনিয়ার কাছে হাজির হলেন, এক আল্লাহর পরিচয় নিয়ে। সেদিনের এতিম শিশু তার মৃত্যু পর্যন্ত সমান দরদ নিয়ে কেঁদে গেছেন তার উম্মতের জন্য। এবং তিনি সেই নবী, যিনি কঠিন বিচার দিবসেও উম্মতের জন্য কাঁদবেন খোদার দুয়ারে।
প্রতি রবিউল আউয়াল মুমিন মুসলমানরা প্রিয় নবী, প্রিয় বন্ধুর জন্য দরদি মনকে উজাড় করে দেন। ভেতরে চলে নবী প্রেমের ঝড়।
সময়ের আলো/এসএকে