সমকালীন বিশ্বে সিরাতুন্নবীর প্রাসঙ্গিকতা

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

ইসলাম

রবিউল আউয়াল প্রতি বছর আমাদের জীবনে ফিরে আসে, কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমাদের সমাজ কি নবীজি (সা.)-এর সিরাতের দিকে ফিরে আসে?

2026-08-25T13:55:26+00:00
2026-08-25T13:55:26+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
সমকালীন বিশ্বে সিরাতুন্নবীর প্রাসঙ্গিকতা
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:৫৫ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রবিউল আউয়াল প্রতি বছর আমাদের জীবনে ফিরে আসে, কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমাদের সমাজ কি নবীজি (সা.)-এর সিরাতের দিকে ফিরে আসে? আমরা কি তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি? নাকি ইতিহাসকে স্মরণ করি, অথচ ইতিহাসের মহান আদর্শকে জীবন থেকে নির্বাসিত করে রাখি? আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত, কিন্তু নৈতিকতায় বিপর্যস্ত; অর্থনীতিতে শক্তিশালী, কিন্তু মানবিকতায় দুর্বল; যোগাযোগে দ্রুত, কিন্তু হৃদয়ে বিচ্ছিন্ন।

এই বহুমাত্রিক সংকটের যুগে সিরাতুন্নবী (সা.) কেবল ধর্মীয় অনুপ্রেরণা নয়, বরং মানবতার জন্য একটি কার্যকর সভ্যতাগত বিকল্প। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এমন এক ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়, যা আধুনিক বিশ্ব হারিয়ে ফেলেছে। তিনি ইবাদত ও কর্ম, পরিবার ও সমাজ, ন্যায় ও দয়া, শক্তি ও ক্ষমা, নেতৃত্ব ও বিনয়- সবকিছুর মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ কারণেই তাঁর সিরাত সময়ের সীমা অতিক্রম করে প্রতিটি যুগে প্রাসঙ্গিক।

নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিষেধক : আজ মিথ্যা, দুর্নীতি, প্রতারণা, ঘুষ, স্বার্থপরতা ও চরিত্রহীনতা সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তার লাভ করেছে। অথচ নবীজি (সা.) নবুয়তের আগেই ‘আল-আমিন’ তথা বিশ্বস্ত ব্যক্তি উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর চরিত্র ছিল সত্য, আমানত, সততা ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সুরা আল-কলম : ৪)। এই একটি আয়াতই প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রকৃত শক্তি চরিত্রে। কোনো জাতি চরিত্রহীন হয়ে উন্নত থাকতে পারে না। সিরাত আমাদের শেখায়, নৈতিকতা ছাড়া সভ্যতা টিকে না।

পারিবারিক সংকটের সমাধান : সমকালীন বিশ্বে পারিবারিক ভাঙন, দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের নৈতিক বিচ্যুতি এবং প্রজন্মগত দূরত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবন এ ক্ষেত্রে এক অনন্য আদর্শ। তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন, তাঁদের সম্মান করতেন, ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন, সন্তানদের স্নেহ করতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল আচরণ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন’ (সহিহ বুখারি)। আজ পরিবারে ভালোবাসার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। সিরাত শেখায় পরিবার কেবল দায়িত্বের নয়; রহমত, সম্মান ও সহানুভূতির প্রতিষ্ঠান।

সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সিরাত : পৃথিবীতে ধনী-গরিবের বৈষম্য, জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ এবং সামাজিক অবিচার আজও বিদ্যমান। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া।’ এই ঘোষণা মানবসমতার এক চিরন্তন সনদ। বিলাল (রা.), সালমান (রা.), সুহাইব (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবিদের মর্যাদা প্রমাণ করে যে, ইসলাম মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে চরিত্র ও তাকওয়ার ভিত্তিতে, বংশ বা বর্ণের ভিত্তিতে নয়।


নেতৃত্বের সংকটে সিরাত : আজকের বিশ্বে নেতৃত্বের বড় সংকট হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। অনেক নেতা জনগণের সেবক না হয়ে প্রভুতে পরিণত হন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের সেবক নেতা। তিনি মসজিদ নির্মাণে শ্রম দিয়েছেন, ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অসুস্থকে দেখতে গেছেন, এতিমকে স্নেহ করেছেন এবং নিজের জন্য বিলাসিতা বেছে নেননি। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের নেতা সে-ই, যে তোমাদের সেবক।’ এই নীতিই ইসলামি নেতৃত্বের ভিত্তি। ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব; শাসন নয়, সেবা, এটাই সিরাতের শিক্ষা।

যুবসমাজের জন্য আলোর দিশা : আজকের তরুণ সমাজ পরিচয় সংকট, মাদক, পর্নোগ্রাফি, হতাশা, বেকারত্ব এবং উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যে সংগ্রাম করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তরুণদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আলি (রা.), মুসআব ইবনে উমাইর (রা.), উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) এবং ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁরা সবাই তরুণ বয়সেই ইসলামের ইতিহাসে অনন্য অবদান রেখেছেন। নবীজি (সা.) তরুণদের শুধু উপদেশ দেননি; তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং চরিত্র গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তাই যুবসমাজের পুনর্জাগরণের জন্য সিরাত একটি কার্যকর মডেল।

শান্তি ও সহাবস্থানের শিক্ষা : বিশ্ব আজ যুদ্ধ, সন্ত্রাস, ঘৃণা ও বিভাজনের আগুনে পুড়ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা সনদ ছিল বহুধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক ঐতিহাসিক দলিল। সেখানে মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য গোত্রের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিনি শত্রুকেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেননি। হুদায়বিয়ার চুক্তি তাঁর দূরদর্শিতা, ধৈর্য ও শান্তিকামী নেতৃত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ।

হৃদয়ের শূন্যতার ওষুধ : সমকালীন মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত আত্মিক শূন্যতা। অর্থ আছে, কিন্তু প্রশান্তি নেই; বিনোদন আছে, কিন্তু আনন্দ নেই; সম্পর্ক আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই। সিরাতুন্নবী (সা.) মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের শিক্ষা দেয়। তাহাজ্জুদ, জিকির, দোয়া, তওবা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর ভরসা- এসবই অন্তরের প্রশান্তির পথ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়গুলো প্রশান্তি লাভ করে’ (সুরা আর-রাদ : ২৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল এই আয়াতের বাস্তব ব্যাখ্যা।

রবিউল আউয়ালের আহ্বান : রবিউল আউয়াল আমাদের শুধু অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় না, এটি বর্তমানকে সংশোধন এবং ভবিষ্যৎকে নির্মাণের আহ্বান জানায়। যদি আমরা নবীজি (সা.)-এর সিরাতকে শিক্ষা, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিজীবনের ভিত্তি বানাতে পারি, তবে আমাদের সংকটের অনেক সমাধান মিলবে। আজ মানবতা নতুন প্রযুক্তির নয়, নতুন চরিত্রের সন্ধানে আছে; নতুন অস্ত্রের নয়, নতুন নৈতিকতার সন্ধানে আছে; নতুন মতবাদের নয়, সত্য ও দয়ার এমন এক আদর্শের সন্ধানে আছে, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখায়। সেই আদর্শের নাম- সিরাতুন্নবী (সা.)।


রবিউল আউয়ালের সবচেয়ে বড় উপহার হলো, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানবতার মুক্তির পথ এখনও সেই পথ, যে পথে হেঁটেছিলেন মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)। তাঁর জীবন কেবল অতীতের গৌরব নয়, এটি বর্তমানের দিশারি এবং ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।

লেখক : সহ-সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদরাসা, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   সমকালীন বিশ্ব  সিরাতুন্নবী  প্রাসঙ্গিকতা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: