মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ ও অনুপম আদর্শ। তাঁর জীবনের সৌন্দর্য শুধু পবিত্র মুখমণ্ডল বা বাহ্যিক দেহাবয়বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর প্রকৃত মহিমা প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর চরিত্র, দয়া, বিনয়, ন্যায়বোধ, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহভীতিতে। ইসলামি পরিভাষায় ‘সুরত’ বলতে মহানবীর পবিত্র বাহ্যিক অবয়ব, শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্বের দৃশ্যমান সৌন্দর্যকে বোঝায়, আর ‘সিরাত’ হলো তাঁর জীবনচরিত, আচার-আচরণ, নীতি, কর্ম এবং মানবতার প্রতি তাঁর আদর্শিক জীবনপদ্ধতির সামগ্রিক রূপ। অর্থাৎ, তাঁর সুরত হলো বাহ্যিক সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা, আর সিরাত হলো অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মহানবীর বাহ্যিক রূপ ও অবয়বের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। হজরত বারা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দর চেহারার অধিকারী এবং সর্বোত্তম গঠনের অধিকারী। তিনি অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না, আবার খাটোও ছিলেন না (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৩৭)। তাঁকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখমণ্ডল কি তরবারির মতো উজ্জ্বল ছিল? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, না, বরং তা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৫২)।
এ ছাড়া হজরত জাবির ইবনু সামুরা (রা.) তাঁর মুখমণ্ডলকে সূর্য ও চাঁদের মতো দীপ্তিমান বলে বর্ণনা করেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৪৪)। হজরত আনাস (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে কোমল কোনো হাত কখনো স্পর্শ করেননি এবং তাঁর শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো সুগন্ধি অনুভব করেননি (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৩০)। এসব বর্ণনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবীকে অসাধারণ বাহ্যিক সৌন্দর্য দান করেছিলেন।
তবে মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত ছিল তাঁর সিরাতে বা মহৎ চরিত্রে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সুরা আল-কলম, আয়াত : ৪)। হজরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিগ্যেস করা হলে তিনি পবিত্র কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন; যার অর্থ দাঁড়ায়, তাঁর সমগ্র জীবনটাই ছিল কুরআনের এক বাস্তব রূপ। তাঁর সিরাতের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি ছিল বিশ্ববাসীর জন্য রহমত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)।
তিনি শত্রুকেও ক্ষমা করেছেন, দুর্বলকে আশ্রয় দিয়েছেন, এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রেখেছেন এবং শিশুদের প্রতি অপার ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিন তাঁর সেবা করেও হজরত আনাস (রা.) তাঁর কাছ থেকে কড়া কোনো ভর্ৎসনা পাননি (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩১০)। বিনয় ছিল তাঁর মহত্ত্বের আরেকটি অনন্য দিক। তিনি আল্লাহর রাসুল হয়েও সাধারণ মানুষের মতো বসতেন, দরিদ্রদের খোঁজখবর নিতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেন না। তাঁর ক্ষমা ছিল উদার, ন্যায়বিচার ছিল আপসহীন এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁর সুরত দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, আর সিরাত দেখে তাঁরা নিজেদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন। এটাই মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের গভীরতম শিক্ষা। বাহ্যিক সৌন্দর্য চোখকে আকর্ষণ করে, আর সিরাতের সৌন্দর্য মানুষের হৃদয়কে চিরতরে পরিবর্তন করে দেয়। আমরা যদি মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসি, তবে শুধু তাঁর পবিত্র নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের জীবনে তাঁর সুন্নাহকে ধারণ করতে হবে, তাঁর চরিত্রকে নিজেদের চরিত্রে প্রতিফলিত করতে হবে এবং তাঁর দয়া, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, বিনয় ও ন্যায়বোধকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সমেয়র আলো/এসএকে