হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর পবিত্র নবুয়ত ও রিসালাত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি এক মহান অনুগ্রহ ও রহমত। রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে নবীদের তাওহিদের দাওয়াত পূর্ণতা লাভ করেছে। সুস্পষ্ট হয়েছে হেদায়াতের পথ এবং মানুষ লাভ করেছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পরিপূর্ণ দিশা।
রাসুল (সা.)-এর মর্যাদা কোনো পার্থিব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তুলনার বিষয় নয়। তিনি সেই পবিত্র রাসুল, যাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন ব্যতীত মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। যাঁর আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত। যাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা এবং মুমিনদেরও যাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে মুমিনের অন্তর ও জিহ্বা দরুদে সিক্ত হয়, তাঁর শানে আলোচনা হলে অন্তরে তাজিম জাগে, তাঁর জীবন স্মরণ হলে সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা নবায়িত হয়।
কুরআনের ভাষায় তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন তথা সারা জগতের জন্য রহমত। রাসুল (সা.)-এর রিসালাতের মাহাত্ম্য তাই কোনো একটি যুগ, ভূখণ্ড বা জাতির ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর আনীত হেদায়েত মানবতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক চিরন্তন অনুগ্রহ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে সারা জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি’ (সুরা আম্বিয়া : ১০৭)। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয়ের মহান মাকাম ও মর্যাদার এক অনন্য দিক উন্মোচন করে দিয়েছেন। যার মধ্যে রাসুল (সা.)-এর সারা রিসালাতের তাৎপর্য বিদ্যমান।
তিনি রহমত, কারণ তাঁর মাধ্যমে মানুষ তাওহিদের পরিচয় পেয়েছে। তিনি রহমত কারণ তাঁর মাধ্যমে কুরআনের হেদায়েত মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তিনি রহমত, কারণ তাঁর সুন্নাহ মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার বাস্তব আদর্শ দিয়েছে। তিনি রহমত, কারণ তাঁর শিক্ষা মানুষের হৃদয়, পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে আল্লাহমুখী করেছে।
রাসুল (সা.) আগমন মানুষের বাহ্যিক জীবনকে শুধু পরিবর্তন করেনি; মানুষের অন্তরের দিকনির্দেশও পরিবর্তন করেছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে মানুষকে আলোয়, গোমরাহির ভেতর থেকে হেদায়েতে এবং সৃষ্টির মোহ থেকে স্রষ্টার পরিচয়ের দিকে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর রিসালাতের মহান তাৎপর্য। রাসুল (সা.)-এর রিসালাতকে বুঝতে হলে কুরআনের সেই ভাষার দিকে তাকাতে হয়, যেখানে তাঁর আগমনকে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন’ (সুরা আলে ইমরান : ১৬৪)। রাসুলের আগমন যে কত বড় নেয়ামত, এই আয়াত তারই সাক্ষ্য বহন করে।
মানুষের কাছে জ্ঞান থাকতে পারে, সম্পদ ও প্রাচুর্য থাকতে পারে, পার্থিব উন্নতি থাকতে পারে; কিন্তু তার রবের পরিচয়, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং আখেরাতের পথ সম্পর্কে ওহির নূর ব্যতীত সেই জীবন পূর্ণতা পায় না। মহানবী (সা.) সেই ওহির নূর নিয়েই মানবতার দ্বারে আগমন করেছেন। তাঁর মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আল্লাহর কালাম পবিত্র আল কুরআন।
পেয়েছে হালাল-হারামের সুস্পষ্ট বিধান, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। তাঁর জীবন হয়েছে কুরআনের বাস্তব শিক্ষা, আর তাঁর রিসালাতের মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সুস্পষ্ট পথ। নবীজির রিসালাতের নূরকে কুরআন আরেক জায়গায় এমন এক ভাষায় তুলে ধরেছে, যা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক নূর এবং এক সুস্পষ্ট কিতাব’ (সুরা মায়িদা : ১৫)।
‘নূর’ শব্দের মধ্যে রয়েছে আলোর অর্থ। কুরআনের হেদায়েতের আলো এবং রাসুল (সা.)-এর রিসালাতের আলো মিলেই মানুষের সামনে সত্যের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। সেই নূর কোনো প্রদীপের আলো নয়, কোনো সূর্যোদয়ের আলো নয়; এটি অন্তরের আলো, যে আলো মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়, নিজের স্রষ্টাকে চিনতে শেখায় এবং নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে শেখায়।
মানুষ যখন নিজের পরিচয় ভুলে যায়, তখন পৃথিবীর প্রাচুর্যও তার অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। যখন স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তখন বাহ্যিক সাফল্যের মধ্যেও এক ধরনের অস্থিরতা জন্ম নেয়। মহানবী (সা.)-এর রিসালাত সেই অন্তর্গত শূন্যতার জন্য হেদায়েতের বার্তা নিয়ে এসেছে। কুরআন ঘোষণা করেছে, ‘আলিফ-লাম-রা। এটি এমন এক কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পারেন’ (সুরা ইবরাহিম : ১)।
মহানবী (সা.)-এর আগমন তাই মানবসভ্যতার নৈতিক ইতিহাসেও এক অনন্য অধ্যায়। তিনি এমন এক সমাজে তাওহিদের কালেমা উচ্চারণ করেছেন, যেখানে বহু উপাস্যের ধারণা মানুষের বিশ্বাসকে গ্রাস করেছিল। তিনি এমন সমাজে ন্যায় ও আমানতের শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে শক্তি অনেক সময় অধিকারের মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল। তিনি মানুষের মর্যাদাকে বংশ, সম্পদ ও ক্ষমতার গণ্ডি থেকে তুলে ঈমান ও তাকওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত : ১৩)।
এই আয়াতের মাধ্যমে মানবমর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সুস্পষ্ট হয়েছে আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার অন্তরের তাকওয়া ও রবের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে। মহানবী (সা.)-এর রিসালাত মানুষকে সেই তাকওয়া, পরিশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী জীবনের পথেই আহ্বান করেছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি