ফুল ভালোবাসার ও সৌন্দর্যের প্রতীক। বিভিন্ন সামাজিক উৎসব বা আয়োজনে ফুল দিয়ে অতিথিদের বরণ করা হয়। ফুলের সঙ্গে যেমন তার নিজস্ব সুগন্ধ জড়িয়ে থাকে, তেমনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন এমন এক অনুপম ফুল, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে মহান রবের তাওহিদ ও রিসালাতের শাশ্বত সুবাস। তাওহিদের এই ফুলের সুবাস কেয়ামত পর্যন্ত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) উভয় জাহানের জন্য অনন্য এক ফুল; এই ফুলের ঘ্রাণ ও সান্নিধ্যে যারা আসবেন, তাদের চরিত্রও প্রিয়নবীর আদর্শে রূপায়িত হবে। তারা লাভ করবেন মহান আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (সুরা আন-নিসা : ৮০)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’। (সুরা আল-আহজাব : ২১)
আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের অন্য কোনো সৃষ্টির ইবাদত করেন না, হযরত মুহাম্মদ (সা.) ব্যতীত অন্য কোনো নবীর ওপর দরুদও পড়েন না এবং কারও এমন অনন্য প্রশংসা করেন না। কেবল শেষ নবীর শানে এটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নিজে ও তাঁর ফেরেশতাকুল প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং মুমিন বান্দাদেরও তাঁর ওপর দরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য দোয়া করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য দরুদ পাঠাও এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’। (সুরা আল-আহযাব : ৫৬)
রোজ হাশরের ময়দানে যখন কঠিন পরিস্থিতিতে সবাই নিজের পরিচয় ও আত্মরক্ষায় ব্যস্ত থাকবে, তখন একমাত্র হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ যখন পেরেশান হয়ে সুপারিশ ও সহায়তার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হবেন, তখন তিনি ব্যাকুল হয়ে তাঁর গুনাহগার উম্মতদের খুঁজে বেড়াবেন।
তাই ইহকালীন জীবনে যারা তাঁর সুন্নাহ ও উপদেশ মেনে চলবেন, আল্লাহ পাক পরকালে তাদের সব ত্রুটি ও পাপাচার ক্ষমা করে দেবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; তা হলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন’। (সুরা আল-ইমরান : ৩১)
আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত ও রিসালাতের পরিধি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এর ফলশ্রুতিতে তিনি আরব ভূমিতে আবির্ভূত হলেও আজ সারা জাহান তাঁর নামে মাতোয়ারা। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি’ (সুরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)।
আরও স্মরণ করুন, যখন মারইয়ামপুত্র ঈসা (আ.) বলেছিলেন, ‘হে বনি ইসরাইল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল, আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং এমন একজন রাসুলের সুসংবাদদাতা- যিনি আমার পরে আসবেন, যাঁর নাম আহমদ’। (সুরা আস-সাফ : ৬)
এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছেন কিংবা ভবিষ্যতে আসবেন, উম্মতের কল্যাণে প্রিয়নবীর চেয়ে বেশি দরদি ও হিতাকাক্সক্ষী দ্বিতীয় কেউ আর আসবেন না। তিনিই একমাত্র নবী, যাঁর হৃদয় মুমিনের দুঃখ-বেদনায় গভীরভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের যেকোনো কষ্ট বা বিপদে তিনি ব্যথিত হন। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু’। (সুরা আত-তাওবাহ : ১২৮-১২৯)
হাশরের মাঠে তৃষ্ণার্ত মানুষের ভিড়ে পানির একমাত্র উৎস হবে হাউসে কাউসার। তীব্র গরমে যখন মানুষ পিপাসায় দিগি^দিক ছোটাছুটি করবে এবং কেউ কাউকে এক ফোঁটা পানি দিয়েও সাহায্য করতে পারবে না, তখনও মহানবী (সা.) হাউসে কাউসারের পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নবীদের মধ্যে একমাত্র মুহাম্মদ (সা.)-কেই হাউসে কাউসার দান করে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি’ (সুরা আল-কাউসার : ১)।
সৃষ্টিজগতের মধ্যে যাঁরা আল্লাহকে স্মরণ করেন ও তাঁর তসবি পাঠ করেন, তাঁদের সবার ওপরে নবীজির স্মরণ ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ আসনে আসীন করা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি’। (সুরা আল-ইনশিরাহ : ৪)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন এক মহান রাসুল- যাঁর প্রশংসা স্বয়ং রাব্বুল আলামিন নিজেই করেছেন। পবিত্র কুরআনের পাতায় পাতায় নবীজির সুমহান গুণগান রয়েছে। আগের যুগের নবী-রাসুলগণও তাঁর আগমনের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। প্রিয়নবীর এই সুখ্যাতি কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
যুগে যুগে কবিরা কবিতা লিখবেন, লেখকরা প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করবেন, গবেষকরা গবেষণা করবেন এবং মুফাসসিররা পবিত্র কুরআনের তাফসির করবেন। যেদিন তিনি ধরণিতে তশরিফ এনেছিলেন, সেদিন পুরো আরব জাহান আনন্দে ফেটে পড়েছিল; আজও তার সুমহান আগমনের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস ও সৃষ্টিজগৎ মুখরিত। প্রিয়নবীর অনুপম খুশবু বা সুবাসে আমাদের জীবন রঙিন হোক। হে আল্লাহ! আপনার প্রিয় হাবিবের সেই নূরানি সুবাস আমাদের সবার জীবনে দান করুন।
সময়ের আলো/মহু