পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস এলেই মুমিনের হৃদয়ে এক অপূর্ব ভাবগাম্ভীর্য, প্রশান্তি ও আনন্দের পবিত্র শিহরণ জাগে। কারণ এই বরকতময় মাসেই ধরার বুকে আগমন করেছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত ও শান্তির সুবাতাস নিয়ে আসা মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর এই ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমনে বিশ্ববাসীর ওপর নেমে এসেছিল হেদায়েত, রহমত ও বরকতের অবিরত বারিধারা।
তিনি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যাঁর নূরে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল অন্ধকার যুগের যাবতীয় কুসংস্কার ও বর্বরতা। পবিত্র কুরআনে তাঁর এই অনুপম আগমন ও নিখাদ দয়ার কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল, তোমাদের যেকোনো দুঃখ-কষ্ট তাঁর পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।’ (সুরা তাওবা : ১২৮)
মানবতার ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর মতো এমন দয়ালু, আত্মত্যাগী ও মানবদরদী ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয়টি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মানবসভ্যতার প্রতিটি স্তরে গভীর ও চিরস্থায়ীভাবে মিশে আছেন তিনি। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মাত্র ২৩ বছরের স্বল্পতম সময়ে তিনি আরব ভূমি থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বে যে শান্তিময় ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব সাধন করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসের পাতায় সম্পূর্ণ বিরল ও অনন্য। তাঁর কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না, ছিল না কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ-সম্পদ কিংবা ক্ষমতার লোভ ও দাপট।
জাহেলিয়াতের সেই নিকষ অন্ধকার যুগে মানুষ যখন নীতি, আদর্শ ও নৈতিকতা সম্পূর্ণ হারিয়ে পশুর চেয়েও অধঃপতিত হয়েছিল, তখন তিনি গুটিকয়েক অনুসারী নিয়ে সেই ক্ষুধা-অনাহারে জর্জরিত বর্বর জাতিকে এক উন্নত, সুশৃঙ্খল, জ্ঞানদীপ্ত ও সোনালি মানবগোষ্ঠীতে রূপান্তর করেছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ের মুসলিম উম্মাহর কোটি কোটি মানুষের বিশাল জনসংখ্যা এবং প্রভূত ধনসম্পদ থাকা সত্ত্বেও আধুনিকতার অন্ধানুকরণে তারা আজ নানামুখী অবক্ষয় ও সংকটে জর্জরিত।
আমাদের আত্মিক স্থবিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে এবং প্রাণহীন সমাজকে গতিশীল করতে রাসুল (সা.)-এর পবিত্র চিন্তা-চেতনা ও সুমহান আদর্শ আবার নতুন করে বুকে ধারণ করতে হবে। তিনি ছিলেন অন্তরের স্বচ্ছতা, মহত্ত্ব, ধৈর্য, সহনশীলতা, সততা, বিনম্রতা, বদান্যতা, আমানতদারি এবং ন্যায়পরায়ণতার এক জীবন্ত প্রতীক।
পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমময় স্বামী ও স্নেহশীল আদর্শ পিতা; কর্মজীবনে ছিলেন বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী ও দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক; আর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে ছিলেন সাহসী যোদ্ধা, প্রজ্ঞাবান ন্যায়বিচারক, যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক এবং সফল ধর্মপ্রচারক। মানবকল্যাণের প্রতিটি ও বহুমুখী ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনুপম ও অতুলনীয় চরিত্রের স্বীকৃতি দিয়ে ইরশাদ করেছেন- ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব : ২১)
নবীজি (সা.)-এর অনন্যসাধারণ মহত্ত্ব স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যখন আমরা তৎকালীন আরব সমাজের গভীর সংকটের দিকে তাকাই। ইসলামপূর্ব সেই যুগে আরব ভূখণ্ডের চিত্র ছিল অত্যন্ত লোমহর্ষক, বিভীষিকাময় ও পঙ্কিল। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষ চরম হিংস্রতা, গোত্রীয় কোন্দল এবং অনৈতিকতায় আষ্টেপৃষ্ঠে লিপ্ত ছিল। দারিদ্র্যের তীব্র ভয়ে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত দাফন করা, বাজারে পণ্যের মতো অসহায় মানুষ কেনাবেচা করা, গোত্রে গোত্রে তুচ্ছ কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং সামাজিক অবিচার ছিল নিত্যদিনের চিত্র।
ধর্মের নামে সমাজে চলত নানা অন্ধ কুসংস্কার এবং মানুষ বলি দেওয়ার মতো নৃশংস ও অমানবিক প্রথা। ঠিক এমন এক নৈরাজ্যপূর্ণ ও বিপর্যস্ত মুহূর্তে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন বিশ্বনবী (সা.)। তাঁর অদম্য ত্যাগ, আজীবন সংগ্রাম, অনুপম চরিত্রমাধুর্য ও ইসলামের সুমহান শান্তির বাণীর ছোঁয়ায় আরবের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্বর জাতি এক নিমেষে সভ্যতার আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। রক্তপাত ও হানাহানি চিরতরে বন্ধ হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনসাফ, সাম্য, মানবাধিকার ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য মেলবন্ধন।
রাসুল (সা.)-এর অনুপম আদর্শ ও ঐতিহাসিক অবদান কেবল তৎকালীন সমাজকেই বদলে দেয়নি, বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য মুক্তির এক চিরন্তন সনদ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। আজকের এই অশান্ত, মূল্যবোধহীন, সংকটকবলিত ও মানবতাহীন পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের অবশ্যই চৌদ্দশ বছর আগের সেই সোনালি ও শাশ্বত অতীতে ফিরে যেতে হবে।
রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ, সুমহান আদর্শ ও ইনসাফভিত্তিক শিক্ষাকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে যথাযথভাবে লালন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। রাসুল (সা.)-এর হাত ধরেই সভ্য পৃথিবীর গতি-প্রকৃতি, উন্নতি ও অগ্রগতির চিন্তার সূচনা হয়েছে। তিনি এসে দিশাহারা জাতিকে মুক্তির অমীয় বাণী শোনালেন, যার মাধ্যমে তাদের সামনে সভ্যতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এবং ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়ের রচনা হয়; যা ছিল মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ টার্নিং ‘পয়েন্ট। সমস্যায় জর্জরিত, মানবতা বিবর্জিত এবং অশান্ত ও অসভ্য পৃথিবীতে মানবতা, শান্তি ও সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে সেই চৌদ্দশ বছর আগে। জীবনকে ঢেলে সাজাতে হবে মহানবীর সুমহান আদর্শে।
সময়ের আলো/কেএইচও