পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, বাংলাদেশ ও চীন ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি এই ব্যবস্থাকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি রোববার (৩০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আরও যোগাযোগের লক্ষ্যে বর্তমানে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের ভিত্তি প্রস্তুতের কাজ চলছে। তাই হ্যাঁ, উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে খুব শিগগিরই এটি শুরু হবে।’
এর আগে দিনের শুরুতে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দুই পক্ষ প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরু করার পাশাপাশি দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করে।
‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক।
দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা—উভয় মাত্রাকে একত্রিত করা প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থার জন্য কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করিনি। তবে ওই পর্যায়ে আলোচনা হবে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘টু প্লাস টু’ ব্যবস্থা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গভীরতা এবং বাংলাদেশের বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘এটি চীনের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সহযোগিতার সর্বোচ্চ পর্যায়ের অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত।’
তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে, তখন চীনের অনুসৃত ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্বলিত অভিন্ন সম্প্রদায়’ ধারণার পাশাপাশি ‘টু প্লাস টু’র মতো উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের অধীনে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের কাছে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা ও গুরুত্বও বাড়ছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন চীন এখন এমন একটি ‘টু প্লাস টু’ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, যেখানে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, এ অগ্রগতি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং সরকারের ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বই তুলে ধরে।
হুমায়ুন কবির বলেন, জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি ‘শক্ত অবস্থান থেকে’ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা পরিচালনা করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘এটি সম্ভব হয়েছে কারণ দেশের জনগণ আমাদের সরকারকে যে ম্যান্ডেট ও আস্থা দিয়েছে, তা আমাদের শক্ত অবস্থান থেকে ইতিবাচকভাবে নিজেদের তুলে ধরে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ করে দিয়েছে।’
চীনকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা এবং তা আরও জোরদারে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত প্ল্যাটফর্মটি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাবে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী চীনকে বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু ও মূল্যবান কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ‘এক চীন নীতি’র প্রতি ঢাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন গতি এবং তা ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্বলিত চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
বৈঠকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা এবং দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ শুরু করাসহ বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল ও পেয়ারা রপ্তানি শুরুর প্রক্রিয়া, চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন হুমায়ুন কবিরকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং ঢাকা-বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে তাঁর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি চীনের নির্বাহী উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিনন্দনবার্তাও প্রতিমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন।
চীনা রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের বিভিন্ন ফলাফল বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর।
মোংলায় একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য চীনা সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ইয়াও বলেন, সিইআইজেডে প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে এবং সেখানে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশিদের জন্য আনুমানিক ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
রাষ্ট্রদূত আগামী দিনে অনুষ্ঠেয় কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সফর ও মতবিনিময় সম্পর্কেও প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিআইডিসিএ)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের (আইডিসিপিসি) মন্ত্রী এবং ইউনান প্রদেশের নির্বাহী ভাইস গভর্নরের বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা।
ইয়াও ওয়েন এ বছরের অক্টোবরে চীন সফরের জন্য হুমায়ুন কবিরকে আমন্ত্রণ জানান।
চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, আলোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আরও বেশি বাস্তবভিত্তিক উপাদান যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।