বিমান টিকিটের অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিমানভাড়া সহনীয় রাখতে ট্রাভেল এজেন্সি আইন ও বেসামরিক বিমান চলাচল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টিকিটের কালোবাজারি ঠেকাতে বিমানের টিকিটে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অন্যদিকে ফ্যাসিবাদের ১৮ বছরে রাজনৈতিক কারণে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। একই সঙ্গে অনিয়মের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার কাজও চলছে বলেও জানান তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এতথ্য জানানো হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা ও টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে ১০ দফা সম্বলিত একটি পরিপত্র জারি করেছে। এর আওতায় সকল ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকিটে তাদের নাম, লাইসেন্স নম্বর ও বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
বিমানভাড়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন খাতে সাধারণত ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। রুট, দূরত্ব, বুকিংয়ের সময়, যাত্রার তারিখ, আসন প্রাপ্যতা, জ্বালানির দাম, বিমানবন্দর চার্জ, সরকারি কর ও অন্যান্য ফি বিবেচনায় নিয়ে টিকিটের মূল্য নির্ধারিত হয়। ফলে চাহিদা ও আসন প্রাপ্যতার ভিন্নতার কারণে একই রুটে বিভিন্ন সময়ে ভাড়ায় পার্থক্য হতে পারে। তিনি জানান, কোনো কোনো সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি অসাধু চক্র শেষ মুহূর্তে টিকিট কালোবাজারির চেষ্টা করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কর্মীদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথা সংসদে জানান বিমানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বলাকা লাউঞ্জে বিশেষ সুবিধা, পৃথক ইমিগ্রেশন চ্যানেল এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক চেক-ইনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করতে অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। এরআগে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ অভিযোগ করেন, টার্মিনালের প্রাক্কলিত ব্যয় কয়েক দফা বেড়ে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রায় ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর আবার ৯০২ কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না এবং এতে ঠিকাদারকে দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে বিমান মন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে শুধু ভবন উদ্বোধন করেই কাজ শেষ দেখানোর প্রবণতা ছিল। কিন্তু থার্ড টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ, সংকেত ও বিভিন্ন সংযোজনের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। এতে প্রায় ২ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অচল হয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি বলেন, জাইকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হলেও টার্মিনাল সচল না থাকায় কোনো আয় হচ্ছিল না। সার্বিক হিসাব পর্যালোচনার পর টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করতে ঠিকাদারের কিছু বকেয়া ও অন্যান্য সংস্থার পাওনা পরিশোধসহ মোট ৯০২ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বরাদ্দ অনুমোদন হলে দ্রুত টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হবে। এতে বর্তমানে ১২ লাখ যাত্রীর পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং সেই আয় থেকে জাইকার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে প্রায় এক হাজার ৪৯৮টি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থান চিহ্নিত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সরকারি দলের সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। পর্যটন খাতের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ মডেলে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পর্যটন মন্ত্রী জানান, সাংস্কৃতিক পর্যটনের প্রসারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, এসওপি এবং যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক কারণে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির উদ্যোগ:
ফ্যাসিবাদের ১৮ বছরে রাজনৈতিক কারণে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত ৮৪৩ জনকে শহীদ হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং দুজনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে বলেও জানান তিনি।
সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নাজমুল হুদার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের ১৮ বছরে বিরোধী দলের রাজনীতি করার কারণে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার বিভিন্ন কারণে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। তাদের তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হচ্ছে। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে সঠিক প্রমাণিত হলে তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়েও যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাইয়ে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে অনেকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায্য স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়মের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রোকেয়া বেগমের এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ পর্যন্ত ৮৪৩ জনকে শহীদ হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে আরো দুজনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর তাদের গেজেটভুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারি তালিকা চূড়ান্ত করার আগে যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চাহিদা অনুযায়ী সারের ঘাটতি নেই। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে চাহিদা অনুযায়ী সারের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকদের সঠিকভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে নীতিমালা অনুযায়ী সার সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে। কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সার বিতরণ কার্যক্রমের নিবিড় মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের আলো/টিকে