নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষার মধ্যেই নেপালে অজ্ঞাত মরদেহের গণদাফন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতদের মধ্যে যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলোর গণদাফন শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।

2026-08-30T23:25:21+00:00
2026-08-30T23:30:37+00:00
 
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষার মধ্যেই নেপালে অজ্ঞাত মরদেহের গণদাফন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৫ পিএম  আপডেট: ৩০.০৮.২০২৬ ১১:৩০ পিএম
নেপালের চিতওয়ানে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতদের জন্য তৈরি দেবঘাট গণকবরস্থানে মরদেহগুলোর পরিচয়সংক্রান্ত নম্বর ট্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। ছবি : রয়টার্স
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতদের মধ্যে যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলোর গণদাফন শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। দেশটির চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি বনাঞ্চলে ইতোমধ্যে শতাধিক অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করা হয়েছে। অন্যদিকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।  

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া উপত্যকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানের দেবঘাট বনে শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে। কয়েক দিন আগেও বনটির পথগুলো ছিল মানুষের হাঁটাচলার জনপ্রিয় স্থান। এখন সেখানে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী গণকবর।   

কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধার করা অনেক মরদেহ কয়েক দিন ধরে বন্যার পানিতে থাকার কারণে দ্রুত পচে গেছে। ফলে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।  

চিতওয়ানের বারতপুরের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, সেটিই ছিল আমাদের প্রধান উদ্বেগ।   

শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা করা হয়। একই সময়ে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলের উপত্যকাগুলোতে একটি হিমবাহ ধসে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। এতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ

অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে নেপাল সরকার। প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা হচ্ছে এবং দাফনের স্থান বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে।

কবরের ওপরে এবং মাটির নিচেও পরিচয়সংক্রান্ত চিহ্ন রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি কবরের সঠিক অবস্থানের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

অজ্ঞাত মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করেছে কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে কোনো পরিবার নিখোঁজ স্বজনের পরিচয় দাবি করলে কিংবা সরকারি নথি ও জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করে তা কবর থেকে তুলে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ কাজে নেপালকে সহায়তা করতে ভারত একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে। দলটি নেপালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও নেপাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করছে।

হাসপাতালের মর্গে মরদেহের চাপ

চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালে উদ্ধার করা মরদেহ রাখার জন্য একটি অস্থায়ী মর্গ তৈরি করা হয়েছে। হাসপাতালের মূল ফটক থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূর থেকেই পচনশীল মরদেহের তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।

প্রায় ৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও হাসপাতালের কর্মী সেখানে মরদেহগুলো সামলানোর কাজ করছেন। তাদের বেশিরভাগের মুখে ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।

রয়টার্সের প্রতিবেদককে মর্গের প্রবেশপথ পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১২৫টি মরদেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক মরদেহে পচন এতটাই বেড়ে গেছে যে চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতালের মর্গে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে এরই মধ্যে সেই সক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি মরদেহ জমা হয়েছে।

দুর্যোগকবলিত এলাকায় মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক অনিল থাপা বলেন, “মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছি, তার অর্ধেকেরও বেশি শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। অনেকের মুখের কোনো চিহ্নই আর দেখা যাচ্ছে না।


নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষা

ভারতপুরের কয়েকশ মিটার দূরে চিতওয়ান এক্সপো সেন্টার এখন নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে আসা পরিবারের সদস্যদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

একটি হলের বাইরে ২০০-র বেশি মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ছবি সেখানে প্রদর্শন করার কথা ছিল, যাতে পরিবারের সদস্যরা ছবি দেখে তাদের স্বজনদের শনাক্ত করতে পারেন।

ভিড়ের অনেকের হাতেই ছিল ব্যাগ ও লাগেজ। এতে বোঝা যায়, তারা নেপালের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলা থেকে ছুটে এসেছেন।

কয়েকটি পরিবার জানায়, তারা আগের দিনই সেখানে পৌঁছেছে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তাদের হলের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এর কাছেই একটি পুরোনো একতলা বাড়িকে শনাক্তকরণের অপেক্ষায় থাকা মরদেহ সংরক্ষণের অস্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাড়িটির বাইরে তিনটি তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। একটি তাঁবুতে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক এবং অন্যটিতে পুলিশের নিবন্ধন কেন্দ্র রয়েছে। মরদেহের দুর্গন্ধ কমানোর জন্য ডেস্কের নিচে ধূপ জ্বালানো হলেও তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না।

রয়টার্সের প্রতিবেদক সেখানে পৌঁছালে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একটি মাস্ক দেন। আরেক কর্মকর্তা কর্মীদের মাস্কের মজুত কমে গেলে তা দ্রুত পূরণ করার নির্দেশ দেন।

ভবনের ভেতরে অন্ধকার কক্ষে বাঙ্কবেডের ওপর সারি সারি বডি ব্যাগ রাখা হয়েছে। মরদেহের পচন ধীর করতে প্রবেশপথের কাছে শুকনো বরফ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনার ও শিল্পমানের শীতলীকরণ যন্ত্র সারাক্ষণ চালু রাখা হয়েছে।

চলছে মরদেহ উদ্ধারের অভিযান

এদিকে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

একপর্যায়ে একটি গাড়িতে করে ১৩টি মরদেহ ওই অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্রে আনা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার মধ্যেই বাইরে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। আরও একটি গাড়ি মরদেহ নামানোর জন্য জায়গার অপেক্ষায় ছিল।

ভবনের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন নিখোঁজদের স্বজনেরা। তাদের একটাই অপেক্ষা—উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জন আছেন কি না, তা জানা।

একটার পর একটা মরদেহ নিয়ে যানবাহন আসতে থাকায় দুর্যোগের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। একই সঙ্গে নিখোঁজদের স্বজনদের কাছে উত্তর দেওয়া এবং নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাও ফুটে উঠছে।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ওপরও শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।

পুলিশ পরিদর্শক অনিল থাপা বলেন, এখানে কাজ করতে আসার পর আমি খাবারের কথাই ভাবতে পারি না। খাওয়ার কথা তো বাদই দিলাম, এমনকি পানিও খেতে ইচ্ছা করে না। 


সূত্র : রয়টার্স 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   নেপাল  মরদেহ  গণদাফন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: