ইসরায়েলের গাজা অভিযান নিয়ে সমালোচনা করা বা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা যাবে না। এমনটাই জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতের বিচারক।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে দেওয়া রায়ে বিচারক নোয়েল ওয়াইজ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার। তাই সরকারের পছন্দ নয়, এমন মত প্রকাশের কারণে কাউকে অভিবাসন আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া সংবিধানসম্মত নয়।
এই মামলাটি করেছিল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত সংবাদপত্র দ্য স্ট্যানফোর্ড ডেইলি। পত্রিকাটি আদালতকে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের ভয়ে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছেন না।
বিচারক ওয়াইজ বলেন, সরকার বা তার নেতাদের প্রশংসা করে এমন কথাই যদি শুধু স্বাধীনভাবে বলা যায়, তাহলে সেটাকে প্রকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলা যায় না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি নিয়ে প্রশ্ন
রায়ে বিচারক প্রায় এক বছর আগে বোস্টনের একটি ফেডারেল আদালতের দেওয়া রায়ের কথাও উল্লেখ করেন। ওই মামলায় বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের সমর্থন এবং ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কারের চেষ্টা করে ট্রাম্প প্রশাসন সংবিধান লঙ্ঘন করেছে।
বিচারক ওয়াইজ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, অভিবাসন আইনের কিছু নিয়ম এতটাই অস্পষ্ট যে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না কোন বক্তব্যের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তার মতে, এ ধরনের অস্পষ্টতা সংবিধানের প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রায়ে ২০২৫ সালের মার্চে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা চার্লি কার্ক নিহত হওয়ার পর তাকে নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সরকারি পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন বিচারক।
‘সরকারের অপছন্দের কথা বললেই শাস্তি দেওয়া যাবে না’
বিচারক ওয়াইজ সতর্ক করে বলেন, সরকারের অপছন্দের মত প্রকাশ করার কারণে মানুষকে ভয় দেখানো হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা যেকোনো ব্যক্তি সরকারের অপছন্দের কথা বললেই সরকারি পদক্ষেপের মুখে পড়বেন।
বিচারকের মতে, এটি মার্কিন সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির বক্তব্য আপনার অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু সেই বক্তব্য প্রকাশের অধিকার রক্ষা করাও একটি স্বাধীন দেশের দায়িত্ব।
রায়ের বিষয়ে শনিবার পর্যন্ত মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ভয়
দ্য স্ট্যানফোর্ড ডেইলির প্রধান সম্পাদক জর্জ পোর্টিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আদালতের রায়কে স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, পত্রিকার সাংবাদিকদের এমন ভয়ে থাকা উচিত নয় যে কোনো প্রতিবেদন লিখলেই তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
মামলাটি করা ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশন-এর আইনজীবী কনর ফিটজপ্যাট্রিকও রায়ের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সরকারের সঙ্গে একমত হওয়া মানুষের জন্য নয়।
বিচারক ওয়াইজ বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বাস্তব প্রভাব ফেলেছে।
তার মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এক ধরনের বার্তা পৌঁছে গিয়েছিল, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বললে বা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করলে ভিসা বাতিল হয়ে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
এর ফলে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী নিজেদের মত প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন।
ভয়ে লেখা প্রকাশ বন্ধ করেছিলেন অনেকে
বিচারক জানান, দ্য স্ট্যানফোর্ড ডেইলিতে কাজ করা কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ লেখা প্রকাশ করা বন্ধ করেছেন, কেউ নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
কেউ আবার আগে প্রকাশিত লেখা সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। কেউ অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যার আশঙ্কায় নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
বিচারক ওয়াইজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকা বিদেশি নাগরিকদেরও সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের এমন ভয়ের মধ্যে রাখা উচিত নয় যে তাদের বক্তব্যের কারণে তাদের ভিসা বাতিল বা বহিষ্কার করা হতে পারে।
বিচারকের মতে, পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকারের কিছু বিশেষ ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতার ব্যবহার এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতেই না পারেন কোন কাজ বৈধ আর কোনটি অবৈধ।
রায়ের শেষ দিকে বিচারক বলেন, মানুষের এমন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে যা অন্যদের কাছে আপত্তিকর হতে পারে, প্রচলিত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে যেতে পারে কিংবা সরকারের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কর্মকাণ্ড বা যুদ্ধের সমালোচনা করতে পারে।
অর্থাৎ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু পছন্দের কথা বলার স্বাধীনতা নয়; সরকারের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অপছন্দের কথাও বলার অধিকার থাকা।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ