নেপালে আকস্মিক বন্যায় তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বন্যায় প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অবকাঠামোতেও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির প্রায় ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর ফলে বন্ধ রয়েছে ৪৩১ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন।
বন্যার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সময় এসব প্রকল্পের বিভিন্ন সুড়ঙ্গে কর্মরত ছিলেন ৯ শতাধিক মানুষ। এরপর থেকে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের উদ্ধারে ত্রিশূলি-৩এ ও ত্রিশূলি-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় বড় ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এখনো সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কারও সাড়া পাওয়া যায়নি।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসেত জানিয়েছেন, টানা তিন দিন অভিযান চালানোর পর রোববার বিকেলে সেনাবাহিনীর একটি দল সুড়ঙ্গের ওপরের অংশে পৌঁছানোর পথ খুঁজে পায়।
উদ্ধারকাজে বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ দল ড্রিলিং মেশিন, এক্সকাভেটর ও হাইড্রোলিক কাটার ব্যবহার করছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, একটি গর্ত তৈরি করার পর দেখা যায়, প্রায় সাত মিটার ব্যাসের ওই সুড়ঙ্গের ভেতরে বেশ উঁচু পর্যন্ত পানি জমে আছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআর) তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মী রয়েছেন। দেশটির সরকার আশা করছে, বিভিন্ন প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ১০০ জনের বেশি কর্মী এখনো জীবিত থাকতে পারেন।
বারবার বাধার মুখে উদ্ধার অভিযান
শনিবার সন্ধ্যায় রসুয়া জেলার ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্প এলাকায় উদ্ধারকারী দল ড্রিলিং মেশিন ব্যবহার করে কাদায় ভরা সুড়ঙ্গের ওপরের দিকে একটি পথ তৈরির চেষ্টা করে। ওই পথ দিয়ে ভেতরে অক্সিজেন পাঠানোর পাশাপাশি একটি ক্যামেরাও পাঠানো হয়।
কিন্তু রাতের বৃষ্টি এবং নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় অভিযান ব্যাহত হয়। পরে খনন করা জায়গাটিও পানিতে ডুবে যায়।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর উদ্ধারকারীরা আবার কাজ শুরু করেন। ড্রিলিং মেশিন, এক্সকাভেটর, হাইড্রোলিক কাটারসহ বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে তারা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
আলজাজিরার সাংবাদিক মিনেলে ফার্নান্দেজ নেপাল থেকে জানিয়েছেন, সরকার উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। জীবিত কেউ ভেতরে আটকে থাকলে কীভাবে তাদের বের করে আনা সম্ভব, তা খুঁজে দেখতে বিশেষজ্ঞদেরও কাজে যুক্ত করা হয়েছে।
সুড়ঙ্গে বাড়ছে পানির চাপ
উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বাধা তৈরি হয়েছে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায়। স্থানীয় সময় রোববার ভোরে কাছের নদীর পানি আবারও বেড়ে যায়।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ভোর ৪টার দিকে বন্যার কারণে ত্রিশূলি নদীর পানির স্তর প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটার বেড়ে যায়। এতে নদীর তীরও ভাঙতে শুরু করে।
এ ছাড়া সুড়ঙ্গ এলাকায় যাওয়ার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেলিকপ্টার অবতরণের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
ভেতরে পাঠানো হচ্ছে অক্সিজেন ও খাবার
সুড়ঙ্গে আটকে থাকা কর্মীদের কাছে খাবার, অক্সিজেন ও আলো পৌঁছানোর জন্য এরই মধ্যে দুটি ছোট পথ তৈরি করা হয়েছে।
নেপালের জ্বালানি, পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহন শাক্য জানিয়েছেন, এসব পথ দিয়ে অক্সিজেন, আলো ও খাবার পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, অন্য একটি পথ তৈরি করে সুড়ঙ্গ ভেঙে আটকে থাকা কর্মীদের বের করে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য আরও ড্রিলিং সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক সামগ্রী আনা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করতে শনিবার চীন ও ভারতের উদ্ধারকারী দলও নেপালে পৌঁছেছে। ফলে স্থানীয় বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও এখন এই প্রাণ বাঁচানোর অভিযানে যুক্ত হয়েছেন।
তবে এতসব প্রচেষ্টার পরও এখন পর্যন্ত সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় নিখোঁজ কর্মীদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ