চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) এই বিপর্যয়ের পর এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।
নেপালের মধ্যাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে কর্মরত ৯০০ জনের বেশি নিখোঁজ শ্রমিককে খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান চলছে।
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজের মোট সংখ্যা ৩ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে কিছু মরদেহ ভেসে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও পৌঁছেছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ধ্বংসাবশেষ জমে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় সেখানে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে। এতে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পরে হ্রদটির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে হওয়ায় আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
নিখোঁজ ৯০০ শ্রমিক কোথায়?
রোববার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৯৩৩ জন নিখোঁজ বা নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারা নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও সুড়ঙ্গে কাজ করছিলেন।
নিখোঁজ শ্রমিকদের মধ্যে নেপাল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের নাগরিক রয়েছেন। তবে প্রতিটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিক কতজন আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শনিবার রাতে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, সুড়ঙ্গের ভেতরে মানুষ আটকা পড়েছেন, এমন অভিযোগ ওঠার পর সরকার উদ্ধারকারী দল মোতায়েনকে অগ্রাধিকার দেয়। ধ্বংসাবশেষ ও পাথর সরিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ পরিষ্কারের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আরও জানায়, সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ খনন ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম দ্রুত করতে ৮২ সদস্যের একটি যৌথ দল মোতায়েন করা হয়েছে। এতে নেপাল সেনাবাহিনীর ৬২ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও নেপাল পুলিশের ২০ জন সদস্য রয়েছেন। গত রাত থেকে তারা টানা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, শনাক্ত না হওয়া মৃতদেহ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্তের জন্য বিভিন্ন জেলার ২১টি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
রোববার সকাল পর্যন্ত নেপালে ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণ করা ১২৭ জন নেপালি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া নেপাল সেনাবাহিনীর ৪৫ জন, পুলিশের ২৭ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ জন সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের তিব্বত অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে, সেখানে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালের ১০৪ জন, প্রতিবেশী ভারতের ৪৯ জন, লাটভিয়ার ৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন, যুক্তরাজ্যের ১৫ জন, কানাডার ৬ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৬ জন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও জার্মানির ৩ জন করে, এবং নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের ১০ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ফিনল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, পর্তুগাল, ইউক্রেন, স্পেন, হাঙ্গেরি ও কাজাখস্তানের একজন করে নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
নিখোঁজ নেপালি নাগরিক ও বিদেশিদের শনাক্ত করতে নেপাল ও চীন যৌথভাবে কাজ করছে। তবে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
নেপালের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রোববার সকালে আরও বৃষ্টির পর ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীরা নিরাপদ স্থানে উঁচু জায়গায় সরে যান। দুর্গম ভূখণ্ড ও পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে কর্তৃপক্ষ এখনো ত্রাণ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে যেতে পারেনি। এই ধাপে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু করার কাজ রয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হলো মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত, অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে নেপাল সহায়তা নিতে চায়নি। কারণ বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় উদ্ধারকারী দল ছড়িয়ে পড়লে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, তারা তা চায়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ১০০ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে চীন। ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান (৩২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করা হয়েছে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/এনএন