নেপালের দেবীঘাটে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি : আল-জাজিরা
কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মানুষ। কারও হাতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি, কারও চোখে উৎকণ্ঠা। কেউ হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, প্রিয় মানুষটি আর ফিরবেন না। আবার কেউ অপেক্ষা করছেন, যদি ধ্বংসস্তূপের কোথাও থেকে পাওয়া যায় তার কোনো খবর।
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এখন এমনই বিষাদময় দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় একের পর এক জনপদ তলিয়ে গেছে, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, ভেঙে পড়েছে সড়ক ও সেতু। আর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারী হচ্ছে মৃত্যুর হিসাব।
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চল মিলিয়ে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। এর মধ্যে নেপালেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩৪ জন। দেশটিতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৯৮ জন। তিব্বতে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে শতাধিক নেপালি নাগরিকসহ এক ডজনের বেশি স্থানীয় নাগরিক রয়েছেন।
নেপালের ত্রিশূলীতে আকস্মিক বন্যার পর ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি : আল-জাজিরা
এই শোকের মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রোববার সকালে নেপালের বিভিন্ন মোবাইল ফোনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বন্যার সতর্কবার্তা। ভোতে কোশি নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ায় নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ধরম রাজ উপ্রেতি জানিয়েছেন, উজানে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তার পর নতুন এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নেপালের নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি থেকে উদ্ধার করা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি : আল-জাজিরা
এদিকে দুর্গত এলাকায় থেমে নেই উদ্ধারকাজ। কাদায় ডুবে থাকা পথ, ভেঙে পড়া সেতু আর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে দুর্গত এলাকার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সড়কটিও পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
রেডক্রসের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে এই দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ছবি : আল-জাজিরা
রেডক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে নেপালে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেই হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, জীবিকা কিংবা পরিবারের সদস্যদের। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘর থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। কাদামাটির স্তূপে চাপা পড়া স্মৃতির ভেতর থেকে যেন জীবনের শেষ চিহ্নটুকু খুঁজে ফিরছেন তারা।
নেপালের ত্রিশূলীতে ঘন কাদার মধ্য দিয়ে এক বাসিন্দাকে উদ্ধারে সহায়তা করছেন এক উদ্ধারকর্মী। ছবি : আল-জাজিরা
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের মর্গের সামনে দৃশ্যটি আরও হৃদয়বিদারক। নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন একটি খবরের জন্য, যে খবরটি হয়তো তাদের জীবনের সবকিছু বদলে দেবে।
স্বজন হারানোর এই শোকের মাঝেও চলছে শেষ বিদায়ের আয়োজন। কাঠমান্ডুর পশুপতি শ্মশানকেন্দ্রে নিহতদের শেষকৃত্য করছেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ চোখের পানি মুছছেন, কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের পাশে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে নেপাল। বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম, ভারী মালামাল পরিবহনে সক্ষম ড্রোন, ডিএনএ পরীক্ষার কিট এবং মরদেহ সংরক্ষণের ফ্রিজার ইউনিট চাওয়া হয়েছে।
নেপালের নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাট এলাকায় তাড়ি নদীর ওপর আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি সেতু। ছবি : আল-জাজিরা
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রায় ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার করে মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য দিচ্ছে ৬৮ লাখ ডলার, আর জাতিসংঘ জরুরি তহবিল থেকে ছাড় করেছে ২৫ লাখ ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিয়েছে ২৩ লাখ ডলার। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনও এক মিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ করেছে এবং আরও ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সংগ্রহের জন্য জরুরি আবেদন জানিয়েছে।
আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ সুন্দা দামাইলের ছবি হাতে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালের (টিইউটিএইচ) মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন তার ভাইয়েরা। ছবি : আল-জাজিরা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও নেপালের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন এবং বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
নিখোঁজ স্বজনদের ছবি কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালের (টিইউটিএইচ) একটি ফটকে লাগিয়ে দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। ছবি : আল-জাজিরা
তবু অর্থ আর ত্রাণের হিসাবের বাইরে এই দুর্যোগের সবচেয়ে বড় ক্ষতটা হয়তো মানুষের মনে। যে ঘরটিতে কয়েক দিন আগেও ছিল হাসি-কোলাহল, সেখানে এখন পড়ে আছে কাদা আর ধ্বংসস্তূপ। যে পথে প্রতিদিন মানুষ ফিরত আপনজনের কাছে, সেই পথেই এখন চলছে উদ্ধারকারী দল।
টিইউটিএইচ হাসপাতালের মর্গের বাইরে নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি : আল-জাজিরা
আর হাসপাতালের মর্গের সামনে, এক হাতে স্বজনের ছবি, অন্য হাতে শেষ আশাটুকু নিয়ে অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ।
কাঠমান্ডুর পশুপতি শ্মশানকেন্দ্রে আকস্মিক বন্যায় নিহত রাসুয়ার বাসিন্দা রোহান শ্রেষ্ঠকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। ছবি : আল-জাজিরা