ঘুংগুরের শব্দে মজিবুরের বেঁচে থাকার লড়াই

মো. নুরে আলম

বিবিধ

রাত নামলেই রংপুর শহরের ব্যস্ত রাস্তায় অন্যরকম এক শব্দ শোনা যায়। ঝনঝন করে বেজে ওঠে ঘুংগুর। মাথায় আলো জ্বলা টুপি।

2026-09-08T17:24:06+00:00
2026-09-08T17:24:06+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবিধ
ঘুংগুরের শব্দে মজিবুরের বেঁচে থাকার লড়াই
মো. নুরে আলম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:২৪ পিএম 
বৃদ্ধ মানুষটির নাম মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। ছবি : সময়ের আলো
রাত নামলেই রংপুর শহরের ব্যস্ত রাস্তায় অন্যরকম এক শব্দ শোনা যায়। ঝনঝন করে বেজে ওঠে ঘুংগুর। মাথায় আলো জ্বলা টুপি। কাঁধে ভারী চানাচুরের ড্রাম। সঙ্গে ছোট্ট একটি স্পিকার। গান বাজে, আর সেই তালে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেন এক বৃদ্ধ। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, মানুষকে একটু আনন্দ দিতেই বুঝি তার এই আয়োজন। কেউ দাঁড়িয়ে দেখেন, কেউ হাসেন, কেউ আবার ১০ বা ২০ টাকার চানাচুর কিনে নিয়ে যান।   

কিন্তু একটু কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যটা। এই নাচ আনন্দের জন্য নয়। এই নাচ তার জীবিকার পথ। বৃদ্ধ মানুষটির নাম মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। বয়স ৭১ বছর। জীবনের এই বয়সে যখন শরীর বিশ্রাম চায়, তখনও তাকে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয়। কারণ ঘরে বসে থাকার সামর্থ্য তার নেই। 

Advertisement
মাথার ওপর পরিবারের দায়িত্ব। আর বুকের ভেতর আরও বড় এক দুশ্চিন্তা; সাত বছরের নাতির গলায় টিউমার। 

মজিবুরের গল্প শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। একসময় মানুষের বাড়িতে কৃষিকাজ করতেন তিনি। সংসারে অভাব ছিল। নিজের সন্তানদের মুখে ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে পারতেন না। সেই অভাবের দিনগুলো তাকে একসময় নিয়ে যায় ভারতে। সেখানে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়। সেই মানুষই তাঁকে শিখিয়েছিলেন ‘ঘটি গরম চানাচুর’ বিক্রি করতে।  

সেখান থেকেই শুরু। পরে দেশে ফিরে রংপুর শহরকে নিজের কর্মক্ষেত্র বানিয়ে নেন মজিবুর। প্রায় ২৫ বছর ধরে একইভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিক্রি করছেন ঘটি গরম চানাচুর। 

চিড়া, চানাচুর আর নানা মসলা মিশিয়ে তৈরি করেন তার বিশেষ এই খাবার। তবে শুধু খাবার বিক্রি করলেই তো আর ভিড় টানা যায় না। তাই নিজের মতো করে তৈরি করেছেন একটি কৌশল। 


পায়ে ঘুংগুর বাঁধেন। মাথায় পরেন আলো জ্বলা টুপি। সঙ্গে থাকে স্পিকার। গান বাজিয়ে নাচেন। কখনো ক্রেতার সঙ্গে হাসি-তামাশা করেন। তার এই অভিনব পরিবেশনা দেখে মানুষ দাঁড়ায়, কথা বলে, তারপর কিনে নেয় ১০ টাকার চানাচুর। এইভাবেই চলে তার সংসার। 

শহরের মানুষও তাকে চেনে। অনেকেই বহুদিন ধরে দেখছেন এই বৃদ্ধকে। কেউ তার চানাচুরের স্বাদের প্রশংসা করেন, কেউ তার পরিশ্রমের। কেউ আবার মনে করেন, এই বয়সে এত ভারী জিনিস নিয়ে রাস্তায় হাঁটা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। 


সেই কষ্টটা অবশ্য সবচেয়ে ভালো জানেন মজিবুর নিজেই। একটি বড় ড্রামে থাকে প্রায় ১৫ কেজি চানাচুরের মালামাল। এর সঙ্গে থাকে আরও কয়েক কেজি সরঞ্জাম। সব মিলিয়ে কাঁধে প্রায় ২০ থেকে ২২ কেজি ওজন নিয়ে হাঁটতে হয় তাকে।

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে বারবার বিশ্রাম নিতে হয়। তবু হাঁটেন। কারণ তার থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই।

মজিবুরের নিজের কোনো পাকা বাড়ি নেই। অল্প জায়গার ওপর কোনোভাবে থাকেন। প্রতিদিন বিকেল ৪টার দিকে বের হন। এরপর রংপুর শহরের একের পর এক জায়গায় ঘুরে বেড়ান— জাহাজ কোম্পানি মোড়, মেডিকেল মোড়, শাপলা চত্বর, বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন এলাকায়।

দিন শেষে বিক্রি হয় কয়েকশ টাকা, কখনো ৭০০, কখনো ১ হাজার টাকার মতো। কিন্তু সেই টাকা পুরোটা তার হাতে থাকে না। পরদিনের মাল কিনতে হয়। মসলা কিনতে হয়। সংসারের খরচ আছে। আছে বাড়ির ভাড়া।

তারপরও তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের মাধ্যমে তাকে চালিয়ে নিচ্ছেন। এই কথার মধ্যেই হয়তো মজিবুরের সবচেয়ে বড় শক্তিটা লুকিয়ে আছে। তিনি কারও কাছে হাত পাততে চান না। তিনি চান কাজ করতে। শুধু কাজটা একটু সহজ হোক। এই কারণেই তার চাওয়া খুব বড় কিছু নয়।

একটি চার্জার ভ্যান। একটি সাইকেল। কিংবা এমন কোনো বাহন, যাতে কাঁধে করে এত ভারী ড্রাম নিয়ে তাকে আর দিনের পর দিন হাঁটতে না হয়।

তিনি জানেন, বয়স হয়েছে। শরীর আগের মতো শক্তি দেয় না। কিন্তু ব্যবসাটা তিনি ছাড়তে চান না। কারণ এই ব্যবসার সঙ্গে শুধু তার নিজের জীবন নয়, পরিবারের খাবারও জড়িয়ে আছে। 

আর আছে তার ছোট্ট নাতি।


সাত বছরের সেই শিশুটির গলায় টিউমার। চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেও গিয়েছেন মজিবুর। চিকিৎসা ও অপারেশনের জন্য প্রয়োজন কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু যে মানুষটির প্রতিদিনের আয় দিয়েই সংসারের খাবার জোটে, তার পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। 

নাতির কথা বলতে গিয়ে থেমে যান মজিবুর। চোখের সামনে তখন হয়তো ভেসে ওঠে ছোট্ট শিশুটির মুখ। তিনি মানুষের কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে চাননি। চানাচুর বিক্রি করেন। গান বাজান। নাচেন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু নিজের বুকের ভেতরের কষ্টটা চেপে রেখেন। কারণ মজিবুর জানেন, অভাবের কথা বললে সহানুভূতি পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি সহানুভূতির ওপর বাঁচতে চান না। তিনি চান নিজের পরিশ্রমেই বাঁচতে। 

তার কথায় বারবার ফিরে আসে একটি আকুতি— কেউ যদি চলাফেরার জন্য একটা ব্যবস্থা করে দিতেন। তাহলে তার পথটা একটু সহজ হতো।

২০ কেজির বোঝা কাঁধে নিয়ে আর এতটা হাঁটতে হতো না। একটু কম কষ্টে আরও বেশি জায়গায় যেতে পারতেন। ব্যবসাটা চালিয়ে যেতে পারতেন। নিজের খাবার জোগাড় করতে পারতেন। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারতেন। হয়তো নাতির চিকিৎসার জন্যও আরও কিছু করার সুযোগ তৈরি হতো।


রংপুর শহরের মানুষ মজিবুরের ঘুংগুরের শব্দ শুনেছেন বহুবার। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরের গল্পটা কি আমরা শুনেছি?

যে ঘুংগুরের ঝনঝন শব্দে মানুষ থেমে যায়, সেই শব্দই হয়তো একজন বৃদ্ধের কাছে প্রতিদিন ঘরে ফেরার পথ। যে নাচ দেখে কেউ বিনোদন পান, সেই নাচই তাঁর কাছে পেটের দায়।

যে চানাচুর ১০ টাকায় কিনে আমরা কয়েক মিনিটের স্বাদ নিই, সেই ১০ টাকার বিক্রির ওপর নির্ভর করে একটি পরিবারের দিনের খাবার। তাই মজিবুরকে দেখে শুধু করুণা করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তার পাশে দাঁড়ানোর। তাকে ভিক্ষা দেওয়ার নয়, তার শ্রমটাকে একটু সহজ করে দেওয়ার। 

একটি ছোট বাহন হয়তো তার কাছে বিলাসিতা নয়। সেটিই হতে পারে তার বাকি জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়। তার পায়ের ঘুংগুর তখনও বাজবে। গানও বাজবে। হয়তো তিনি তখনও নাচবেন। মানুষের হাতে তুলে দেবেন গরম চানাচুর।

শুধু কাঁধের ২০ কেজির বোঝাটা একটু কমে যাবে। আর সেই দিন তার ঘুংগুরের শব্দে হয়তো শুধু বেঁচে থাকার আকুতি থাকবে না। থাকবে একটু স্বস্তি। থাকবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ। থাকবে একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের দাঁড়ানোর গল্প। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   ঘুংগুর  মজিবুর 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: