মাদকের আগ্রাসনে চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

মাদকের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। খুন, ছিনতাইয়ের মতো অনেক ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসছে মাদকের ভূমিকা। সমাজ

2026-09-11T04:48:00+00:00
2026-09-11T04:48:28+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
মাদকের আগ্রাসনে চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৮ এএম  আপডেট: ১১.০৯.২০২৬ ৪:৪৮ এএম
প্রতীকী ছবি
মাদকের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। খুন, ছিনতাইয়ের মতো অনেক ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসছে মাদকের ভূমিকা। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনেও ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে মাদক। এর বিপরীতে গ্রেফতারের পর আইনের মারপ্যাঁচে সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। দিনের আলো থেকে রাতের আঁধার— কোথাও যেন নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষ। একের পর এক অপরাধের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। 

শহর থেকে প্রত্যন্ত এলাকাতে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। হাত বাড়ালেই মিলছে গাঁজা, ইয়াবাসহ উচ্চমূল্যে বিভিন্ন মাদক। এমনকি অনলাইনে অর্ডার দিলে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদকদ্রব্য। জল, স্থল, আকাশ সব মাধ্যমেই বানের পানির মতো দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের ভয়ানক সব মাদক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

মাদকের অর্থ জোগাড় করতে ঘটছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এমনকি খুনের ঘটনাও। বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে দেশব্যাপী। তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। আবার মাদক কারবার টিকিয়ে রাখতে বাড়ছে অস্ত্রের ব্যবহার। নারী-শিশুদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক পরিবহনে।

কেউ যেন মাদকের মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়ে না তুলতে পারে সে লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৩৩ অনুযায়ী অভিযোগ পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পুলিশের অপরাধী তদন্ত বিভাগ মাদকের মাধ্যমে অবৈধ অর্থে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করছে। কিন্তু তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না মাদকের আগ্রাসন।

ডিএনসি ও গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী দেশের ২৪টি জেলার দেড় শতাধিক পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে দেশের ভেতর। চিহ্নিত রুটগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধারে পর রুট পরিবর্তন করে কারবারিরা। প্রতিনিয়ত কৌশল পাল্টে ফেলে কারবারিরা। ফলে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদকের আগ্রাসন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে ৯ ও ১২ বছর বয়সি দুই শিশু পেটের ভেতর থেকে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। মাদক পাচারকারীরা ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে শিশু দুটির পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে পাচার করছিল। এর আগে নারীদের গোপনাঙ্গে, পুরুষের পায়ুপথের ভেতর থেকেও উদ্ধার করা হয় ইয়াবা। ফলের ভেতর, মাথার খোপায়, সবজির ভেতর বিভিন্ন কায়দায়, নানা বেশে পাচার করা হচ্ছে মাদক।

মাদকের পরিসংখ্যান : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) সূত্রে জানা যায়, ডিএনসি, পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ডের অভিযানে সাড়ে ৯ বছরে ৩৩ কোটি, ৭৬ লাখ, ৭৫ হাজার ৬৫৪টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি ইয়াবা জব্ধ করছে সংশ্লিষ্টরা।

ডিএনসি থেকে প্রাপ্ত মাদক সংক্রান্ত মামলা ও সাজা বিষয়ে সাড়ে ৯ বছরের তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে ২৩ হাজার ২০৯টি বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ৯ হাজার ৯৩০টি মামলায় সাজা দেওয়া হয়। আর আদালতের ১৩ হাজার ২৭৯ মামলায় খালাসের রায় দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন ১১ হাজার ১২১ জন এবং খালাস পান ১৪ হাজার ৯৫৫ জন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদক মামলায় অর্ধেকের বেশি আসামি খালাস পেয়ে যান। খোদ পুলিশ প্রধানও এ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, আইনের ফাঁকফোকরের কারণে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের অনেক সময় দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হয় না। আইজিপি বলেন, মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হলেও আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা যায় না। পরে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অতি সম্প্রতি মাদক-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ঘটনা জনমনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সাভারে মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে। হত্যার ঘটনায় জড়িতরা ছিল মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এ প্রসঙ্গে র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে অধিকাংশেরই কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। হামলার সময় তারা মাদকাসক্ত ছিল।

গত রোববার রাজধানীর দারুসসালামে মাদক-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে স্ত্রীকে গুলির ঘটনায় স্বামী, ছেলেসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্র, গুলি ও মাদক।

গত ৩০ আগস্ট রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগে মাদক কারবারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাস্তার লাইট বন্ধ করে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন।

গত ৫ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর এলাকার একটি মাদক স্পটে অভিযানের আগে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সদস্যদের ওপর হামলা চালায় মাদক কারবারিরা।

অপরাধের চিত্র : মাদকের বিস্তারের পাশাপাশি দেশে বাড়ছে খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ডাকাতির ঘটনাতে ৩১৭টি মামলা হয়, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১ হাজার ৬৭টি, খুনের ঘটনাতে ২ হাজার ৭৬টি, অপহরণের ঘটনায় ৫৯৯টি এবং চুরির ঘটনায় মামলা হয় ৫ হাজার ৬৩৬টি।

২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল। ওই বছরে সারা দেশে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয় ৭০২টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮২টি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতে মামলা হয় ৩ হাজার ৭৮৬টি, অপহরণের ঘটনাতে ১ হাজার ১০১টি এবং চুরির ঘটনায় মামলা হয় ৯ হাজার ৬৬৮টি।

অন্যদিকে ২০২৪ সালে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৯০টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪০৪টি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতে মামলা হয় ৩ হাজার ৪৪০টি, অপহরণের ঘটনাতে ৬৪৮টি, চুরির ঘটনায় মামলা হয় ৮ হাজার ৬৬৫টি এবং সিঁধেল চুরির ঘটনাতে মামলা হয় ২ হাজার ৬৫৫টি।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত অড়াই বছরে দেশে ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, অপহরণ ও চুরি ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে ডাকাতির ঘটনায় প্রতি মাসে গড়ে মামলা ছিল ৪১টি, ২০২৫ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫৯টি এবং ২০২৬ সালে হয় ৪৫টি। ২০২৪ সালে ছিনতাইয়ে ঘটনায় প্রতি মাসে গড়ে মামলার সংখ্যা ছিল ১১৭টি, ২০২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৭৩টি এবং ২০২৬ সালে প্রতি মাসে হচ্ছে ১৫২টি। খুনের ঘটনায় ২০২৪ সালে প্রতি মাসে গড় মামলা ছিল ২৮৭টি, ২০২৫ সালে ৩১৫টি এবং ২০২৬ সালে ২৯৭টি। ২০২৪ সালে প্রতি মাসে অপহরণের ঘটনায় গড়ে মামলা হয় ৫৪টি, ২০২৫ সালে ৯২টি এবং ২০২৬ সালে ৮৬টি। চুরির ঘটনায় ২০২৪ সালে গড়ে মামলা হয় ৭২২টি, ২০২৫ সালে ৮০৬টি এবং ২০২৬ সালে প্রতি মাসে মামলা হচ্ছে ৮০৫টি।

সমাজ ও অপরাধবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, মাদকসেবী ও মাদক কারবারি উভয়ই দেশের আাইনশৃঙ্খলা পরিস্থিকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন এই সমাজ ও অপরোধবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে দেশে চলমান অপরাধমূলক কার্যক্রম সামাল দিতেই যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা মাদকসেবী এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আমাদের নেই।

ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, মাদক কারবারিদের সহজ জামিন প্রাপ্তিতে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি আছে। একজন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়, কিন্তু তারপরও তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। তার অর্থ যিনি মামলা দিচ্ছে তার গাফিলতি আছে। তিনি এমনভাবে মামলাটি দিচ্ছে যার ফলে জামিন প্রাপ্তি সহজ হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক এখন মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। যা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মাদকের আগ্রাসন রুখতে ডিএনসি, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   মাদক  সর্বগ্রাসী  আগ্রাসন  চ্যালেঞ্জ  বাংলাদেশ  আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: