ইতালির ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরে স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্যানেল থেকে সেরা পরিচালকের পুরস্কার ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ জিতেছেন বাংলাদেশের নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার জন্য এ স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
ভেনিস উৎসবের ‘অরিজোন্তি’ বিভাগে স্থান পাওয়া সিনেমাটি দিয়ে এই পুরস্কার অর্জন করেন রুবাইয়াত। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।
শনিবার গ্লিটজকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় রুবাইয়াত বলেন, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের দেশের সিনেমা পুরস্কৃত হওয়া তার জীবনের অন্যতম সুন্দর ও আনন্দের মুহূর্ত। সিনেমাটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, কোনো বাণিজ্যিক সাফল্য কিংবা পুরস্কার পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্মাণ করেননি। নিজের জন্যই সিনেমাটি বানিয়েছেন এবং এটিকে একটি পরীক্ষামূলক কাজ হিসেবে দেখেছেন তিনি।
রুবাইয়াত বলেন, নির্মাণের সময় উৎসব বা পুরস্কারের কথা মাথায় থাকে না; ভালোবাসার জায়গা থেকেই চলচ্চিত্র বানানো হয়। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে জুরি পর্যন্ত সিনেমাটি যে মাত্রায় গ্রহণ করেছেন, সেটিকে প্রত্যাশার চেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
পুরস্কার গ্রহণের সময় জুরিদের মন্তব্যের কথাও জানান এই নির্মাতা। তার মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমা বলতে অনেক সময় দারিদ্র্য, বিষাদ কিংবা দুর্দশার গল্পকেই সামনে আনা হয়। কিন্তু ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সে পরিচিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে এক উচ্চবিত্ত পরিবারের গল্প বলেছে।
সিনেমাটিতে উদযাপনের আবহের পাশাপাশি ‘বডি হরর’ ঘরানার অতিপ্রাকৃত উপাদান রয়েছে। প্রচলিত ছকের বাইরে এমন একটি গল্প নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বীকৃতি পাওয়া সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন রুবাইয়াত।
ভেনিসে ছয় দিনের অভিজ্ঞতা
গত ৬ সেপ্টেম্বর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। নিজের জীবনের অন্যতম আনন্দময় দিন হিসেবে সেই দিনটিকে বর্ণনা করেছেন রুবাইয়াত।
তিনি বলেন, প্রিমিয়ারের দিন এত ব্যস্ততা ছিল যে এক ধরনের ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, ওই দিনটিকে আরও একটু উপভোগ করা উচিত ছিল।
২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ভেনিস উৎসব শনিবার শেষ হয়েছে। ছয় দিনের এই আয়োজন ঘিরে বিদেশের মাটিতে বড় একটি দল নিয়ে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাকেও বিশেষ বলে মনে করছেন রুবাইয়াত।
তিনি জানান, উৎসবে যাওয়ার সময় থেকেই তার ইচ্ছা ছিল পুরো দল এক পরিবারের মতো একসঙ্গে উদযাপন করবে। সে কারণেই রেড কার্পেটে সাউন্ড এডিটর থেকে অভিনয়শিল্পী— সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলেন তিনি।
এই সফরে ব্যক্তিগতভাবেও বেশ কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে বলে জানান নির্মাতা। তার বোন লন্ডনে নিজের ছোট সন্তানকে রেখে তাকে সমর্থন দিতে ভেনিসে গিয়েছিলেন। বিষয়টিকে নিজের জন্য বিশেষ এক অনুভূতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ভেনিসে ইতালীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাদার বিশেষ প্রদর্শনী ‘প্রাদাস্ফিয়ার’-এ আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন রুবাইয়াত। সেখানে অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন ও ফ্যাশন আইকন মিউচিয়া প্রাদার সঙ্গে আড্ডা এবং সিনেমাটি নিয়ে আলোচনাকেও বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
সিনেমার পর্তুগিজ চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসের উচ্ছ্বাসও রুবাইয়াতের কাছে বিশেষ হয়ে ধরা দিয়েছে। চিত্রগ্রাহক সাধারণত পুরো শুটিংজুড়ে গম্ভীর থাকলেও প্রিমিয়ারের দিন তাকে আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত দেখে আবেগাপ্লুত হন নির্মাতা।
শেষ দৃশ্যে কেঁদেছেন দর্শক
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়াতেও সন্তুষ্ট রুবাইয়াত। তিনি জানান, সিনেমার শেষ দৃশ্য দেখে অনেক দর্শক কেঁদেছেন। বিভিন্ন জায়গায় দর্শক সিনেমাটি দেখে তাদের ভালো লাগার কথাও জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের সিনেমা এভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানুষের মন জয় করতে পারাকে নিজের জন্য বিশেষ অনুভূতি হিসেবে দেখছেন তিনি।
ভেনিসের পর সিনেমাটি নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক সফরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রুবাইয়াত। খুব শিগগিরই তিনি উত্তর আমেরিকার টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে যাবেন। এরপর তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবেও।
দুই দশকের ভাবনা থেকে সিনেমা
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্মাণের ভাবনা রুবাইয়াতের মাথায় ছিল প্রায় দুই দশক ধরে। ছোটবেলায় একটি পার্লারে শোনা গল্প ও সেই সময়ের কিছু স্মৃতি তাকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে ফিরেছে। সেই স্মৃতি থেকেই ঢাকার একটি বিউটি পার্লার, একটি বিয়ে এবং শৈশবের ভয়কে কেন্দ্র করে সিনেমাটির গল্প তৈরি করেছেন তিনি।
এর আগে সিনেমাটি নিয়ে রুবাইয়াত বলেছিলেন, সৌন্দর্য বলতে সমাজ কী বোঝে— সেই ধারণাকে প্রশ্ন করাই ছিল তার অন্যতম উদ্দেশ্য। রূপচর্চার আড়ালে থাকা যন্ত্রণা এবং পার্লারকেন্দ্রিক সৌন্দর্যচর্চার মাধ্যমে কীভাবে একটি মেয়েকে সমাজের নির্ধারিত ছাঁচে ‘নারী’ হিসেবে তৈরি করা হয়, সেটিও সিনেমায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।
সিনেমাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আবহসংগীতের কম্পোজার ছাড়া এর প্রায় প্রতিটি বিভাগের প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন নারী কলাকুশলী।
চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগালের লিওনর তেলেস, যিনি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ারজয়ী। প্রধান আলোকসজ্জা প্রযুক্তিবিদের দায়িত্বে ছিলেন ফ্রেদেরিকা আর গোমেজ। সম্পাদনায় ছিলেন ফ্রান্সের রাফায়েল মার্তা হোলগার এবং প্রোডাকশন ডিজাইনে কাজ করেছেন ভারতের জোনাকী ভট্টাচার্য।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম। প্রকল্পটিতে দেড় বছর সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর অডিশনের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান চরিত্রের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।
বাংলাদেশি কলাকুশলীদের মধ্যে সহকারী পরিচালক হিসেবে ছিলেন রাজীব রাফি, জাহিন গুহরাত ইসলাম ও সাদিয়া আনজুম। শিল্প নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন সাদাব জাফর এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন দামীর খান।
ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি ও বাংলাদেশের খনা টকিজ যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’।
নির্মাতার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সিনেমাটির আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার হবে। আর আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকের জন্যও সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রুবাইয়াত হোসেন।
সময়ের আলো/জেডি