অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে।
এর পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ জানান, নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলো এরই মধ্যে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ হেলিকপ্টারে যাতায়াত করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করেছেন। পাশাপাশি হোটেল ওয়েস্টিনসহ বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অর্থ ব্যবহার করে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া দুই বোনজামাই ও ভাগনের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে প্রকল্পটির বরাদ্দ ও গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তার বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুস লেনদেনে তদবির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান বর্তমানে চলমান রয়েছে।
দুদক আরও জানিয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন করে পদায়নের আদেশ দেওয়ার বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর আগে, গত ২ সেপ্টেম্বর নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। একই সঙ্গে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় নেওয়া হয়।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং দুদকের বক্তব্যের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ।
গত বুধবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
এরপর তার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জনি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের কাছে আইনি নোটিশ পাঠান।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পাঠানো ওই নোটিশে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
পরদিন শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে আখতারুল ইসলাম বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, কোনো তদন্তের ফলাফল কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার ওই বক্তব্যের কারণে তাকে নিয়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়।
তার দাবি, এর ফলে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে, এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ নিয়ে যা বললেন আসিফ মাহমুদ
অভিযোগের বিষয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ