ম্যানচেস্টার ডার্বি মানেই উত্তেজনা, ইতিহাস আর চাপের ম্যাচ। তবে এবার ম্যানচেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লড়াইয়ে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করছে দুই কোচের সম্পূর্ণ ভিন্ন ফুটবল দর্শন। একদিকে এনজো মারেসকার সিটির কঠোর কাঠামো, অন্যদিকে মাইকেল ক্যারিকের ইউনাইটেডে খেলোয়াড়দের বেশি স্বাধীনতা।
মোরেসকার ফুটবলের ভিত্তি পজিশনাল প্লে। মাঠে খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট জায়গা ও দায়িত্ব থাকে, বল পজিশনে থাকলে সিটির ৩-২-৫ কিংবা ৩-১-৩-৩ কাঠামো প্রায় নির্দিষ্ট থাকে। ফলে প্রতিপক্ষ আগে থেকেই বুঝতে পারে সিটি কী করতে চাইছে, কিন্তু বারবার অনুশীলন করা সেই প্যাটার্নের দ্রুত বাস্তবায়ন ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মারেসকার কাছে খেলোয়াড়ের স্বাধীনতারও নির্দিষ্ট সীমা আছে। তার ভাষায়, খেলোয়াড় যদি মাঠের সব জায়গায় ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়, সেটি স্বাধীনতা নয়, বরং বিশৃঙ্খলা। তার পরিকল্পনায় খেলোয়াড়কে বল পাওয়ার পর নিজের অবস্থান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু পুরো দলের কাঠামো ভেঙে ফেলার অনুমতি থাকে না।
ক্যারিকের ইউনাইটেড অবশ্য তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন। রক্ষণভাগে নির্দিষ্ট কাঠামো থাকলেও মাঝমাঠ ও আক্রমণে খেলোয়াড়দের পরিস্থিতি বুঝে জায়গা বদলের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও মাতেউস কুনহা বলের কাছাকাছি যেতে কিংবা উইংয়ে সরে যেতে পারেন। প্রতিপক্ষ তাদের অনুসরণ করলে মাঝখানে জায়গা তৈরি হয়, আর অনুসরণ না করলে বলের আশপাশে ইউনাইটেড সংখ্যাধিক্য তৈরি করতে পারে।
তবে ক্যারিকের এই স্বাধীনতা পুরোপুরি পরিকল্পনাহীন নয়। ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের জন্য কিছু অভিন্ন কৌশলগত নীতি রয়েছে। প্রতিপক্ষকে বলের দিকে টেনে এনে দ্রুত ফাঁকা জায়গায় বল পাঠানো এবং তিনজনের ছোট ছোট পাসিং কম্বিনেশনের মাধ্যমে চাপ থেকে বেরিয়ে আসা তাদের অন্যতম অস্ত্র। খেলোয়াড়েরা নির্দিষ্ট জায়গায় না থেকেও পরিস্থিতি বুঝে এসব ত্রিভুজ তৈরি করেন।
এই দর্শনের বড় সুফল পেয়েছেন ফার্নান্দেজ। ক্যারিকের অধীনে মাঠজুড়ে ঘোরাফেরার স্বাধীনতা পাওয়ার পর তার আক্রমণাত্মক অবদান বেড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হয়েছেন। বিপরীতে সিটিতে রায়ান শেরকির মতো সৃজনশীল খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মোরেসকা চান, বল নিজেদের অর্ধে থাকলে শেরকি কিছুটা নিচে নেমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করুন, কিন্তু প্রতিপক্ষের অর্ধে বল গেলে তাকে বিপজ্জনক জায়গায় থাকতে হবে।
এখানেই ম্যানচেস্টার ডার্বির কৌশলগত আকর্ষণ। সিটি চাইবে নিজেদের পরিচিত কাঠামো ও পজিশনাল ফুটবলের মাধ্যমে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে। ইউনাইটেডের লক্ষ্য হতে পারে সেই কাঠামো ভেঙে নিজেদের খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা কাজে লাগানো।
দুই পদ্ধতির কোনটি বেশি কার্যকর হবে, তার উত্তর মিলবে মাঠেই। নির্দিষ্ট কাঠামো দ্রুত ধারাবাহিকতা এনে দিতে পারে, আবার খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা তৈরি করতে পারে অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত। তাই মোরেসকার ‘ফিক্সড’ সিটি আর ক্যারিকের ‘ফ্লুইড’ ইউনাইটেডের ডার্বি লড়াই শুধু দুই দলের নয়, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও পরীক্ষা।
সময়ের আলো/টিকে