নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। এখনো প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি একজন কর্মকর্তা বলেন, এক সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গেজেটের কোনো খবর নাই। সেজন্যই সবার মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছে যে, আবার কোথায় আটকালো!
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো দেওয়ার কথা থাকলেও গত ১০ বছর ধরে তা হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১ সেপ্টেম্বর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে সরকার। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবেও বিষয়টি জানানো হয়। তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হতে পারে।
তবে প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
তবে সাবেক আমলারা বলছেন, প্রজ্ঞাপন জারি হতে কিছুটা সময় লাগায় হতাশ হওয়ার কারণ নেই।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর পে-স্কেল ঘোষণা হওয়ায় এবার মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছে, খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই রয়েছে।
অতীতে প্রজ্ঞাপন জারিতে কত সময় লেগেছিল?
চলতি বছরের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে।
ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর ১৫ ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন মাস পর অর্থ মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
এর প্রথম ধাপ হলো নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করা। এই কাজটি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো নতুন পে-স্কেলের খসড়ায় সাধারণত কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়বে, তার একটি সামগ্রিক প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করতে হয়। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন শ্রেণির ক্ষেত্রে কীভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে এবং তার হিসাব কী হবে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করা হয়।
জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর হবে, সেটিও প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে এসব কাজ সম্পন্ন করতেই বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়।
প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির পর সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব সংবিধান বা চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী সময়ে যেন কোনো আইনি জটিলতা বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ না থাকে।
একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়।
ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ জানান, এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
চূড়ান্ত খসড়া পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেটি মুদ্রণের জন্য সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে পাঠান। মুদ্রণ শেষ হলে সেটি সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এখনও আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি খসড়া
মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও প্রজ্ঞাপনের খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়নি।
রোববার বিকেলে বিবিসি বাংলাকে আইন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গত সপ্তাহে তারা শুনেছিলেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে-স্কেলের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। কিন্তু এখনো সেটি তাদের হাতে পৌঁছায়নি।
তাহলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের দুই সপ্তাহ পরও খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে কেন?
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি খসড়া আটকে রাখার নয়। গেজেট প্রকাশের আগে যেসব প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেগুলো সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগছে।
জানা যাচ্ছে, বর্তমানে সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নতুন কাঠামো অনুযায়ী যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, দ্রুতই খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
কার কত বেতন বাড়ছে?
এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন যে বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ তাদের বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ হচ্ছে।
অন্যদিকে সর্বনিম্ন বা ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন এই পে-স্কেল মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই মাস থেকেই হিসাব করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন।
প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দিতে নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
কী ছিল জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল।
ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
কমিশনের সুপারিশে বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। যাতায়াত ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব ছিল।
পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেয় তারেক রহমানের সরকার।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ