যদি কোনো সন্ত্রাসবাদী হুমকির মুখে বিশেষজ্ঞরা মানবজাতি বিপন্ন হতে চলেছে এমন সতর্কবার্তা দেন, তবে মার্কিন সরকার সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শিগগিরই মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে এআই প্রতিষ্ঠাতাদের এমন সতর্কতাকে থোড়াই কেয়ার করছে ওয়াশিংটন চালানো রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেন, ‘নেতিবাচক শক্তি’ এমন কিছু কল্পনা করছে যা ‘আসলে ঘটবেই না’।
হাউস স্পিকার মাইক জনসন জরুরি আইন পাস করার আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে সিএনএনের জেক ট্যাপারকে বলেন, এআই প্রতিষ্ঠানের নেতারা যারা ‘সীমা বাড়াচ্ছেন’, তারা চাইলেই এর গতি কমাতে পারেন। কিন্তু কংগ্রেসকে তাড়াহুড়ো করে কোনো কাজ করা উচিত নয়। রিপাবলিকানদের দাবি হলো, মার্কিন এআই শিল্পের গতি কমালে সুপার-ইন্টেলিজেন্সের প্রতিযোগিতায় চীন অনেক এগিয়ে যাবে।
এভাবে তারা এই বিতর্ককে মানবজাতির নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে কম দেখিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপান্তরিত করছেন। রিপাবলিকানদের এই নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে সরব হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ ডেমোক্র্যাট নেতারা। ওবামা বলেছেন, সরকার নির্দেশিত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্ব একটি ‘বিপজ্জনক’ সীমা অতিক্রম করবে।
রাজনৈতিক মোড়ক : স্বয়ং এআই শিল্পের নেতাদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রাজনৈতিক একটি মোড়কের মতো মনে হচ্ছে। মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে এআই ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুই দলের প্রার্থীরা এআই অবকাঠামো নিয়ে জনগণের ক্রোধকে কাজে লাগাচ্ছেন। বিশাল, কুৎসিত ডেটা সেন্টার (যা বিদ্যুৎ ও পানি গিলে খায়) নির্মাণে স্থগিতাদেশের আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু এআই বিরোধিতা ছড়িয়ে পড়ছে। এটি বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের ক্রোধ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। যদিও বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এনবিসি নিউজের এক মতামত গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা এআই নিয়ে উৎসাহী নয় বরং উদ্বিগ্ন।
‘এআইয়ের কারণে বিপুল মানুষ চাকরি হারাবে’ এমন শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ার এমন একসময়ে এনবিসির মতামত গবেষণাটি বলছে, বেশিরভাগ নাগরিক ট্রাম্প অর্থনীতির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। বাড়তি ইউটিলিটি বিলের জন্য ডেটা সেন্টারকে দায়ী করছেন তারা। এটি সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে, যা এই নির্বাচন মৌসুমের নম্বরপ্রধান আলোচ্য বিষয়। আবার এই এআই কয়েকজন বিলিয়নেয়ার প্রযুক্তি নেতাদের কাছে কুক্ষিগত থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ তারা চাইলেই এআই ব্যবহার করে সমাজে নতুন ও বিপজ্জনক উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন। আবার চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এটাও একটি বাস্তব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা, যার আগামী বছরগুলোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
এই দ্রুত বিকশিত রাজনৈতিক পরিবেশ মিডটার্ম ও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এআইকে আরও শক্তিশালী বিষয়ে পরিণত করতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা আশা করছেন এ ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা আগামী নির্বাচনকে পুনর্নির্ধারণ করতে পারে এবং পরিবর্তনের গতি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যদি তারা হাউস বা সিনেট ফিরে পায়। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরেকটি এমন বিষয় চান না যেখানে প্রেসিডেন্টকে জনমতের প্রতি উদাসীন মনে হয়।
এআই কেন এত উত্তেজনাময় রাজনৈতিক বিষয় : গত সপ্তাহে এআই রাজনীতি সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উঠে এসেছে। অ্যানথ্রপিকের সিইও ড্যারিও অ্যামোডেই শনিবার বলেন, এই শিল্পের গতি কমানো দরকার। সোমবার প্রচারিত সিএনএনের অ্যান্ডারসন কুপারের সঙ্গে একক সাক্ষাৎকারে তিনি এআই নেতাদের আহ্বান জানান, এই প্রযুক্তি যেন মানবজাতির ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে কাজ করতে। শনিবার ওপেনএআইর সিইও স্যাম অল্টম্যানও এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অ্যামোডেইর সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন এবং এআই প্রতিষ্ঠানে ‘স্বাধীন মূল্যায়নকারী’ নিয়োগের আহ্বান জানান। ইলন মাস্কও লেখেন, ‘ড্যারিও ঠিক বলছেন’। গুগলের ডিপমাইন্ডের চেয়ার ডেমিস হাসাবিসও একই সুরে কথা বলেছেন। এর আগে এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের একটি চমকপ্রদ মন্তব্য বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘যারা এআই তৈরি করছেন, তারা নিজেরাই মন থেকে বিশ্বাস করেন যে এই দশকের শেষের মধ্যেই এটি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’
এই মারাত্মক হুঁশিয়ারিগুলো নিয়ে ওয়াশিংটনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র মতভেদ। সমালোচকরা ভয় পাচ্ছেন, স্বয়ংক্রিয় এআই সিস্টেমগুলো এত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে তারা বিশ্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে। অন্যদিকে সন্দেহবাদীরা বিষয়টিকে শুধুই আতঙ্ক ছড়ানো বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের দাবি, টেক-জায়ান্টরা নিজেদের পণ্যের প্রচার বাড়াতেই এমন নাটকীয়তা তৈরি করছেন। তদুপরি, শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই যেকোনো নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের সঙ্গে এমন ভয়ভীতি ছড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।
এর পেছনে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন সবসময়ই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সর্বনিম্ন রাখার পক্ষপাতী। তারা প্রচলিত শিল্প খাত এবং বহুগুণে শক্তিশালী এআই খাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখতে চান না। তা ছাড়া, এআই খাতের এই জোয়ার থামানো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। কারণ, এটি বর্তমানে মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি; এর বুদবুদ বা ‘বাবল’ ফেটে গেলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
অন্যান্য জটিলতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ : জটিল ও অস্পষ্ট এই প্রযুক্তির অগ্রগতি এতটাই দ্রুত ঘটছে যে, সরকারগুলোর পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করার আইন তৈরি করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি যেসব রাজনৈতিক নেতার ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব, তারা নিজেরাই এই প্রযুক্তির ক্ষমতা ও ঝুঁকি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। চীনকে টেক্কা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের যুক্তিরও একটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। চীনকে পেছনে ফেলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার প্রশ্নে ট্রাম্পের বক্তব্য হলো— আমরা এআইতে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি এবং আমরাই বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক দেশ। আমি নিশ্চিতভাবেই এটিকে এভাবেই রাখতে চাই।
অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারাও এআই গবেষণায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটাকে আত্মঘাতী মনে করেন। ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের ডিরেক্টর কেভিন হ্যাসেট সতর্ক করে বলেছেন, এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো কোনো দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠী যদি জৈব অস্ত্র তৈরির জন্য আমাদের চেয়েও শক্তিশালী কোনো এআই ব্যবহার করা শুরু করে। মানবজাতির কল্যাণে এআইকে আন্তর্জাতিক নিয়মের অধীনে আনতে হলে বৈশ্বিক চুক্তির প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এমন আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপন্থী, যা মার্কিন একক প্রভাবকে খর্ব করতে পারে। তা ছাড়া, স্বৈরাচারী শাসক বা অশুভ গোষ্ঠীগুলো যে এমন আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?
তবে, লাগামহীন এআই কেবল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যই হুমকি নয়; এটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার মূল ভিত্তি অর্থাৎ ‘জাতীয় স্থিতিশীলতা’র জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আসন্ন সম্মেলনে এই বিষয়টি আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে। যা বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
উদাসীনতার মাশুল হবে চড়া : মানবজাতির এই ঐতিহাসিক মোড়ে এআই নিয়ে ট্রাম্পের হাল্কা ও উদাসীন মনোভাব প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি বিষয়টিকে ছোট করে দেখছি না। তবে আপনারা জানেন, এতে খারাপের চেয়ে ভালোই অনেক বেশি হবে। এর আগে তিনি আরও বলেছিলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমাদের কাছে সবসময়ই এদের থামানোর উপায় থাকবে। ট্রাম্পের এমন হালকা মন্তব্য অনেকেই কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে তার উদাসীন প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন। যা পরবর্তী সময়ে তার রাজনীতি ও দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। যেমনটি তিনি তখন পরীক্ষা বন্ধ করে করোনা কেস কমানোর উদ্ভট পরামর্শ দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি এআইর এই গভীর অস্তিত্ব সংকটকেও তিনি কেবল হালকা চালেই দেখে যাচ্ছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে