বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্রের মূল সূচকগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশেই গণতন্ত্রের মূল সূচকগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। দ্য গার্ডিয়ানে মঙ্গলবার প্রকাশিত স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির জেরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি সূচকে পরিবর্তন ঘটে (বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার এবং কার্যকর সংসদ)।
পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সততা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়সংক্রান্ত সাতটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এই অগ্রগতিগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবর্তিত গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার ও অধ্যাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন— ডিজিটাল মাধ্যমে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধমূলক আইনের বাতিল এবং গুমের ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রথম আইনি কাঠামো প্রণয়ন।
এই বৈশ্বিক চিত্রের পাশাপাশি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে সংঘটিত গণআন্দোলন এবং রাজনৈতিক পালাবদলের বিষয়টিকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী নেতাদের হটাতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। কোটা সংস্কার ও পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত সরকারের পতন ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার হিসেবে দেখছেন।
যদিও গণআন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার অবসান ঘটেছে, তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, অল্প সময়ের মধ্যে গভীর ও অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধন করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রক্রিয়া চলছে। দশকের পর দশক ধরে দুর্বল হয়ে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিগুলোকে পুনর্নির্মাণ করাটাই এখন গণতন্ত্রের সূচক সামনে এগিয়ে নেওয়ার মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়েই নাগরিক সমাজের ওপর চাপ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে ভিন্নমত দমন, দমনমূলক আইন এবং মুক্তচিন্তার ওপর নানা ধরনের অদৃশ্য ও দৃশ্যমান বাধার সংস্কৃতি লক্ষ করা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করার যে সংস্কৃতি বা প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো ট্রানজিশনাল বা পরিবর্তনশীল গণতন্ত্রের দেশগুলোর জন্য স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করা একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনব্যবস্থায় জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে গণতন্ত্রের সূচকে স্থায়ী অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়।
ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র যখন ব্যাকস্লাইডিং বা পেছনের দিকে হাঁটার চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন বাংলাদেশের সামনে রয়েছে এক যুগসন্ধিক্ষণ। তরুণ প্রজন্মের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর, রাষ্ট্রকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হলে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকারের ভিত মজবুত করতে হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় সংস্কার কঠিন হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূচককে স্থায়ীভাবে ইতিবাচক ধারায় ফেরানো সম্ভব।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি