মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে সঞ্চয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। সঞ্চয়পত্রে মানুষের আগ্রহ আবার বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। গত চার বছরের মধ্যে কোনো একক মাসে এটি সর্বোচ্চ। অথচ সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট বিক্রি ছিল মাত্র ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। দৈনিক সময়ের আলোয় গতকাল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। এই পরিসংখ্যান সঞ্চয়পত্রের জনপ্রিয়তা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবার এই প্রশ্নও সামনে আনছে যে, নাগরিকদের বিনিয়োগের বিকল্প সুযোগগুলো সংকুচিত হচ্ছে কি না বা কোথাও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে কি না।
মানুষ সাধারণত বাড়তি টাকা ব্যাংকে রাখে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে কিংবা সঞ্চয়পত্র কেনে। এখন দেশের বাস্তবতায় এই তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে সঞ্চয়পত্রকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছেন অনেকে। ব্যাংক খাতের সংকট নাগরিকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করেছে। পুঁজিবাজারের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের হাতে সঞ্চয়ও কমছে। জীবনযাপনের খরচ মিটিয়ে বাকি যে টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে সেটি তারা সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক জায়গায় রাখতে চাচ্ছেন। সেই হিসাব করেই মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে নির্ধারিত মুনাফা পাওয়া যায়, প্রয়োজন হলেই ভাঙানোর সুযোগ থাকে। এসব কারণে এর প্রতি মানুষের বরাবরই আকর্ষণ আছে।
মানুষের আগ্রহ বাড়লেও মনে রাখতে হবে যে, সঞ্চয়পত্র সরকারের ঋণের উৎস। এর পেছনে সরকারের ব্যয় কম নয়। গত অর্থবছরে ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যার সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু মুনাফাই ছিল ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর অর্থ হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ সরকারের কাছে নতুন করে যত টাকা এসেছে, প্রায় ততটাই খরচ হয়েছে পুরোনো দায় পরিশোধে। ৩১ জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্র বাবদ সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
এসব কারণে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা কমিয়ে করা হয়েছে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সরকারের দিক থেকে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমানোর যৌক্তিকতা আছে। উচ্চ মুনাফার সঞ্চয়পত্রের দায় ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে। এই চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় রাষ্ট্রকেই। তাই সরকারি ঋণের খরচ কমানোর বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তবে সঞ্চয়পত্রকে শুধু সরকারের ব্যয়বহুল ঋণের উৎস হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। এটি অনেক মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয়। বিশেষ করে নারী, পেনশনার, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এর সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই এর বিক্রি কমানোর জন্য এমন কোনো নীতি নেওয়া উচিত নয় যার প্রভাবে সাধারণ মানুষের নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে উচ্চ মুনাফার কারণে সরকারের ভবিষ্যৎ দায়ও বাড়তে দেওয়া যায় না। এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন নীতিগত ভারসাম্য।
মানুষ কেন সঞ্চয়পত্রকে অন্য বিনিয়োগের চেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করছে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। সঞ্চয়পত্রে মানুষের আস্থা থাকা ভালো। তবে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের প্রতি অনাস্থার কারণে যদি মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে তা হলে সেটাকে অর্থনীতির জন্য সুখকর বার্তা বলা যাবে না। দেশে একটি সুস্থ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, এর ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরলে, পুঁজিবাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে নাগরিকদের বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি