সময়ের আলো গ্রাফিকআবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিনের দামও বেড়েছে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পেট্রোল পাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার খরচও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের একটি বড় অংশ ভোক্তার কাঁধেই চাপে।
বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রভাবে সাধারণ মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। বাস, ট্রাক, নৌযান, সেচযন্ত্র ও বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রমে ডিজেল ব্যবহার হয়। যে কারণে এর দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। কৃষকের সেচ খরচও বাড়ে। বাজারে পণ্য আনার খরচও বাড়বে। যার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আগস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী সার্বিক মূল্যস্ফীতি (পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে) ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। সেটা হলে সাধারণ মানুষ চাপে পড়বে। যেসব মানুষের আয় বাড়েনি তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে।
২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছিল ৩৪ টাকা, পেট্রোলের দাম বেড়েছিল ৪৪ টাকা, অকটেনের দাম বেড়েছিল ৪৬ টাকা। তারপর মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়েছিল। ২০২২-এর জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরের মাসে আগস্টে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ২০২২ সালের চেয়ে ভিন্ন। তবে এটা অস্বীকার করা যায় না যে, জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় পরিবহন খরচ ও পণ্যের দাম বাড়ে অযৌক্তিকভাবে। এবার পরিবহন খরচ ও পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে কি না সেটা কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখা জরুরি। বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগে কেউ যেন বাড়তি মুনাফা না করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বোধগম্য কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বড় লোকসানের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরাও মানছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানির দামের সমন্বয় করা দরকার। সেটা করা না গেলে বিপুল ভর্তুকির চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সমন্বয়ের পুরো বোঝা কি ভোক্তার ওপরই পড়বে? জ্বালানি খাতের ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা, পরিচালন ব্যয় এবং কর-শুল্ক কাঠামোও একই সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার।
জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এক লাফে বেশি দাম না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে সমন্বয় করা যায় কি না সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি জ্বালানির ওপর কর ও শুল্কের কাঠামো পর্যালোচনা করার ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত জুনে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এখন তেলের দাম বাড়ল। নিম্ন আয়ের মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই চাপ সামলানো সম্ভব হবে কি না সেটা একটা প্রশ্ন। এসব মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় কীভাবে সেটাও নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলে সরকারের আর্থিক চাপ কমানো সহজ হয়। তবে এর প্রভাবে যদি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়ে তবে তার ভার শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে। কাজেই জ্বালানি খাতের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগও থাকতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে