ড. মো. আনোয়ার হোসেন
গ্রাফিক : সময়ের আলো এশিয়ার উদীয়মান ও অন্যান্য দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পোশাক শিল্পে মজুরির বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। তাইওয়ানে অদক্ষ শ্রমিক ১,৩০,০০০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিক ১,৮০,০০০ টাকা মজুরি পান। হংকংয়ে অদক্ষ শ্রমিক ১,৬০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২,২০,০০০ টাকা মজুরি পান। ম্যাকাওতে অদক্ষ শ্রমিক ১,৪৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২,০০,০০০ টাকা পান। ব্রুনাইতে অদক্ষ শ্রমিক ৮০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১,১৫,০০০ টাকা পান। মালদ্বীপে অদক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা পান।
পূর্ব তিমুরে অদক্ষ শ্রমিক ২০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২৮,০০০ টাকা পান। ইয়েমেনে অদক্ষ শ্রমিক ১২,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৭,০০০ টাকা পান। ইরাকে অদক্ষ শ্রমিক ২৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা পান। সিরিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ১০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৫,০০০ টাকা পান। ফিলিস্তিনে অদক্ষ শ্রমিক ২৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪০,০০০ টাকা পান।
লাতিন আমেরিকার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের পোশাক কারখানার মজুরি কাঠামো নিম্নরূপ। গুয়াতেমালায় অদক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা মজুরি পান। হন্ডুরাসে অদক্ষ শ্রমিক ৩৪,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪৮,০০০ টাকা মজুরি পান। নিকারাগুয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ২৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা পান। কিউবায় অদক্ষ শ্রমিক ১৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২২,০০০ টাকা পান। ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে অদক্ষ শ্রমিক ৩৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫৫,০০০ টাকা পান। হাইতিতে অদক্ষ শ্রমিক ১৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২৫,০০০ টাকা পান। পানামায় অদক্ষ শ্রমিক ৬৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৯২,০০০ টাকা পান। বলিভিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৩০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪২,০০০ টাকা পান। গায়ানায় অদক্ষ শ্রমিক ৩২,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪৫,০০০ টাকা পান। সুরিনামে অদক্ষ শ্রমিক ৩০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪৪,০০০ টাকা পান।
আফ্রিকার অনুন্নত ও প্রগতিশীল অন্যান্য দেশের মজুরির হার এখানে তুলে ধরা হলো। সেনেগালে অদক্ষ শ্রমিক ১৮,০০০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিক ২৫,০০০ টাকা মজুরি পান। আইভরি কোস্টে অদক্ষ শ্রমিক ২০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২৮,০০০ টাকা মজুরি পান। ক্যামেরুনে অদক্ষ শ্রমিক ১৭,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২৪,০০০ টাকা পান। অ্যাঙ্গোলায় অদক্ষ শ্রমিক ১৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২২,০০০ টাকা পান। তানজানিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ১৪,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ২০,০০০ টাকা পান। উগান্ডায় অদক্ষ শ্রমিক ১২,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৭,০০০ টাকা পান। রুয়ান্ডায় অদক্ষ শ্রমিক ১৩,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৮,০০০ টাকা পান। মালাউইতে অদক্ষ শ্রমিক ৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১১,০০০ টাকা পান। মোজাম্বিকে অদক্ষ শ্রমিক ১১,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৬,০০০ টাকা পান। সুদানে অদক্ষ শ্রমিক ১০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১৫,০০০ টাকা পান।
ইউরোপের সবশেষ ১০টি দেশের পোশাক খাতের মজুরি চিত্র নিচে বর্ণনা করা হলো। লাতভিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৮৫,০০০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিক ১,২০,০০০ টাকা মজুরি পান। বেলারুশে অদক্ষ শ্রমিক ৪৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৬৫,০০০ টাকা মজুরি পান। ইউক্রেনে অদক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা পান। মলদোভায় অদক্ষ শ্রমিক ৩০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪২,০০০ টাকা পান। আলবেনিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৪০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫৫,০০০ টাকা পান। নর্থ মেসিডোনিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৪২,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৬০,০০০ টাকা পান। বসনিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৪৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৬৫,০০০ টাকা পান। মন্টিনিগ্রোতে অদক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৭২,০০০ টাকা পান। সার্বিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৪৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৭০,০০০ টাকা পান। রাশিয়াতে অদক্ষ শ্রমিক ৫৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৮০,০০০ টাকা পান।
ওশেনিয়া অঞ্চলের বাকি ১০টি দেশের মজুরির বিবরণ দিয়ে বৈশ্বিক তালিকা শেষ করছি। ভানুয়াতুতে অদক্ষ শ্রমিক ৩০,০০০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিক ৪২,০০০ টাকা মজুরি পান। সলোমন দ্বীপপুঞ্জে অদক্ষ শ্রমিক ২৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা মজুরি পান। টোঙ্গাতে অদক্ষ শ্রমিক ২৮,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪০,০০০ টাকা পান। টুভালুতে অদক্ষ শ্রমিক ২৬,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৩৭,০০০ টাকা পান। কিরিবাতিতে অদক্ষ শ্রমিক ২৪,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৩৪,০০০ টাকা পান। নাউরুতে অদক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা পান। পালাউতে অদক্ষ শ্রমিক ৫০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৭২,০০০ টাকা পান। মাইক্রোনেশিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক ৩৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৪৮,০০০ টাকা পান। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে অদক্ষ শ্রমিক ৪০,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ৫৮,০০০ টাকা পান। কুক দ্বীপপুঞ্জে অদক্ষ শ্রমিক ৮৫,০০০ টাকা ও দক্ষ শ্রমিক ১,২০,০০০ টাকা পান।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের মজুরির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত নগণ্য ছিল।
১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৫০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকের বেতন ছিল ২৫০ টাকা। সেই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মজুরি বোর্ড বা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না বললেই চলে। ফলে মালিকপক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো সামান্য মজুরি নির্ধারণ করত। জীবনযাত্রার ব্যয় কম হলেও এই অতি ক্ষুদ্র আয় দিয়ে শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত।
আশির দশকে পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটতে শুরু করলে মজুরি নির্ধারণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে প্রথম মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে অদক্ষ শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৫৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই সময়ে দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়। এই সময়ে রফতানি আয় বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরির মান তেমন উন্নত হয়নি। নামমাত্র এই বেতন বৃদ্ধি দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
নব্বই দশকে দেশের পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে এক বিশাল শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৪ সালে নতুন মজুরি বোর্ড অদক্ষ শ্রমিকদের বেতন ৯৩০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের বেতন ১,২০০ টাকা নির্ধারণ করে। এই সময়ে কারখানার সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অন্ধকারেই রয়ে যায়। নামমাত্র এই বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষের দানা বাঁধতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে বড় আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
নতুন শতাব্দীতে পদার্পণের পর ২০০৬ সালে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তীব্র আন্দোলনের মুখে অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি ১,৬৬২ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকের মজুরি ২,৪৯৮ টাকা করা হয়। এরপর ২০১০ সালে অদক্ষদের ৩,০০০ টাকা এবং ২০১৩ সালে তা ৫,৩০০ টাকা করা হয়। ২০১৮ সালে অদক্ষদের জন্য ৮,০০০ টাকা সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারিত হয়। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিবারই শ্রমিকদের রাজপথে নেমে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হয়েছে।
সাম্প্র্রতিক ২০২৩ সালের শেষভাগে এসে অদক্ষ পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে দক্ষ শ্রমিকদের গ্রেডভিত্তিক মজুরি বাড়িয়ে প্রায় ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছিল।
২০২৪ ও ২০২৫ সাল জুড়ে কার্যকর থাকা এই মজুরি কাঠামো বর্তমানে দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে অনেকটা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখন নিম্নস্তরে নেমে এসেছে।
বর্তমান ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা চলমান বেতন বৃদ্ধির দাবিতে তীব্র আন্দোলন ও সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছেন। শ্রমিকদের প্রধান দাবি হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সর্বনিম্ন মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা। কারণ, বাজারে চাল, ডাল, তেল ও বাড়িভাড়ার আকাশচুম্বী দামের কারণে বর্তমান বেতনে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে শ্রমিক পরিবারগুলো ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়ছে।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পেছনে অন্যান্য খাতের বেতন বৃদ্ধির বৈষম্য ও কারণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের সরকারি চাকরিজীবী এবং অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই বিষয়টি শ্রমিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও রাজপথে নামার জেদ তৈরি করেছে।
উন্নত দেশগুলোর ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে দাম বাড়াতে চান না, পোশাকের দাম বাড়ালেও তার সুফল সাধারণ শ্রমিকদের কাছে এসে পৌঁছায় না। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে রাজপথে আন্দোলনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। তবে শ্রমিকদের কখনোই উচিত নয় যে আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করা। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থান পরিপ্রেক্ষিতে মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকদের বাস্তবসম্মত সমাধান করা উচিত বলেও মনে করি।
বৈশ্বিক পোশাক খাতের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি এখনও অত্যন্ত নিম্নস্তরে রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা জরুরি। মালিকপক্ষ, সরকার ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি মানবিক ও ন্যায্য মজুরি কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তবেই দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পখাত ভবিষ্যতে সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ থাকবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে