গ্রাফিক : সময়ের আলো তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ শিল্পের ওপর নির্ভর করছে লাখো শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। একই সঙ্গে দেশের রফতানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ আসে এই খাত থেকে। পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাও প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা পোশাক শিল্পের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ বেড়েছে। শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। এমন একটি মজুরি কাঠামো দরকার, যাতে শ্রমিকরা সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন এবং কারখানাগুলোও উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে।
মালিকপক্ষের উদ্বেগও বিবেচনার দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ এবং ক্রয়াদেশের ওঠানামার কারণে অনেক কারখানা চাপে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানার পক্ষে একসঙ্গে বড় অঙ্কের মজুরি বাড়ানো কঠিন হতে পারে। কাজেই মজুরি বাড়াতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির যেন সৃষ্টি না হয় যার ফলে কারখানা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়।
সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। মজুরি বোর্ডের কাজ যেন অযথা দীর্ঘায়িত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিষয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু মজুরি নির্ধারণ করলেই হবে না, উৎপাদনের পরিবেশও উন্নত করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা এবং রফতানির বাধাগুলো দূর করতে হবে।
শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া থাকতে পারে। তাদের শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর পথ অনুসরণ করতে হবে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, কারখানায় হামলা কিংবা সড়ক অবরোধ কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে না। সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় শ্রমিকদেরই কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়, মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশের রফতানি আয় কমে যায়। কোনো পক্ষের উসকানিতে পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সংযত আচরণ করতে হবে।
তৈরি পোশাক শিল্প শুধু মালিকদের ব্যবসা নয়, এটি লাখো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এ শিল্পের সাফল্যের পেছনে শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। আবার শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। তাই বিরোধ নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে। নতুন মজুরি বোর্ডকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শ্রমিকের মুখে হাসি এবং কারখানায় উৎপাদনের গতি নিশ্চিত করতে পারলেই পোশাক শিল্পের স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি