গ্রাফিক : সময়ের আলো এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। গত ২২ বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সবচেয়ে কম। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে।
গত বছরও ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছিল। এবার সেই ধারা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই ফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। এবার এমন ফল বিপর্যয়ের কারণ কী সেই প্রশ্ন উঠেছে। সরকার বলছে, আগের মতো খাতায় উদারভাবে নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা প্রকৃত যোগ্যতা অনুযায়ী নম্বর পেয়েছে।
পরীক্ষার মূল্যায়নে স্বচ্ছতা অবশ্যই জরুরি। কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা করা হয়েছে? শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শুধু পরীক্ষার খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করলেই চলবে না। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
এবার ইংরেজির পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিষয় দুটি নিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিক্ষা পায়। তার পরও তাদের বড় একটি অংশ এই ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে এসব বিষয় পড়ানো হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধাও নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। এই ঘাটতি দূর না করে ভালো ফল আশা করা কঠিন।
শিক্ষকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাবও বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। আবার শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থী পড়ানোর দিকে কারও কারও বেশি আগ্রহ দেখা যায়। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব নয়। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো বাড়ালেই শিক্ষার উন্নতি হবে না। পাঠদানের গুণগত মান বাড়াতে হলে শিক্ষকের পেছনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
এবারের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল, প্রশ্ন বিতরণে অসংগতি এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যার অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। করোনা মহামারির কারণে তৈরি হওয়া শিখনঘাটতিও অনেক শিক্ষার্থী কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর পর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এসব ঘটনার প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। ফল বিপর্যয়ের পেছনে কোন কারণ কতটা প্রভাব ফেলেছে সেটার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া দরকার।
আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যও ফল বিপর্যয়ে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো শিক্ষার সুযোগ পায়। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার্থীরা একই পাঠ্যবই পড়লেও সবার শেখার পরিবেশ এক নয়। এই বৈষম্য দূর না করে সবার কাছ থেকে সমান ফল আশা করা অন্যায্য।
যেসব প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, সেগুলোর অবস্থা আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। সেখানে শিক্ষক সংকট, পাঠদানের দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনার সমস্যা কিংবা শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতা আছে কি না, তা জানতে হবে। এ জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইংরেজি ও তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষার দুর্বলতা দূর করতে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমী হতে হবে। তবে তাদের শেখানোর দায়িত্ব যাদের, তাদের দায়ও কম নয়। পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন ও সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা কিংবা অতীতের অব্যবস্থাপনার ওপর দোষ চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে