ব্যর্থতা হোক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একটি ঐতিহাসিক ক্ষণ। এই ফলাফল কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন মাত্র নয়। এটি মূলত

2026-11-01T05:45:09+00:00
2026-11-01T05:45:09+00:00
 
  রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ২০২৬
ব্যর্থতা হোক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:৪৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একটি ঐতিহাসিক ক্ষণ। এই ফলাফল কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন মাত্র নয়। এটি মূলত তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের এক প্রতিফলন। সমাজ ও পরিবারের জন্য এই দিনটি গভীর  আবেগ বহন করে। তাই ফলাফল যা-ই হোক না কেন, জীবনের গতিপথ কখনো এখানে থমকে দাঁড়ায় না।

কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক পরম আনন্দের মুহূর্ত। তোমাদের এই অর্জনের জন্য জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। এই সাফল্য তোমাদের জীবনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। 

সাফল্যের এই আনন্দময় মুহূর্তে প্রথমে ধন্যবাদ জানাতে হবে মহান সৃষ্টিকর্তাকে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তোমাদের প্রিয় পিতা-মাতার। তারা নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে তোমাদের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন। 

তাদের অসীম ধৈর্য ও ত্যাগ আজ সফলতায় রূপ নিয়েছে। তাই পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনম্র ও কৃতজ্ঞ থাকা প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য। একই সঙ্গে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে সম্মানিত শিক্ষকদের। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া এই পথ অতিক্রম করা অসম্ভব ছিল। শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও স্নেহ আজ তোমাদের এই চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।

অনেকেই হয়তো আশানুরূপ জিপিএ-৫ বা এ প্লাস পাওনি। এতে বিন্দুমাত্র হতাশ হওয়ার বা ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। একটি নির্দিষ্ট গ্রেড কখনো মানুষের মেধার চূড়ান্ত পরিমাপক হতে পারে না। জিপিএ-৫ না পেয়েও পৃথিবীতে বহু মানুষ শীর্ষস্থানে আরোহণ করেছেন। ভবিষ্যতের সঠিক পথ নির্বাচনে অভিজ্ঞ ও গুরুজনদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। 

মনে রাখবে, সাফল্যের এই ধারাকে ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। পড়াশোনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি একটি বিষয়। উচ্চশিক্ষার স্তরে গিয়ে অলসতা করলে পেছনের সব অর্জন বৃথা যাবে। তাই প্রতিদিনের পড়াশোনা প্রতিদিন শেষ করার মানসিকতা সর্বদা ধরে রাখতে হবে। সাফল্য যত বড়ই হোক না কেন, নম্রতা বজায় রাখা আবশ্যক। বিনয়ী মানুষ সমাজে সবার কাছে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লাভ করে। অহংকার মানুষের পতনের মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। তাই অর্জিত মেধা ও সাফল্যকে মানুষের কল্যাণে বিনয়ের সঙ্গে উৎসর্গ করতে হবে।


ফলাফলের এই মুহূর্তে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যারা কোনো কারণে অনুত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের কখনোই তাচ্ছিল্য করবে না। উপহাস বা কটু কথা তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে। বরং তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে পাশে দাঁড়ানো প্রকৃত মানবিকতা।

কেবল ভালো ছাত্র হওয়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ ও আদর্শ জীবনযাপন করার পরিকল্পনা করো। নৈতিকতা ও সততা ছাড়া শিক্ষার কোনো প্রকৃত মূল্য নেই। দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশ ও দশের সেবা করার মানসিকতা এখন থেকেই অন্তরে শক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে।

এবার আসি তাদের কথায়, যারা আশানুরূপ ফলাফল করতে পারোনি। সাময়িক এই ব্যর্থতায় জীবন ও স্বপ্ন কখনো শেষ হয়ে যায় না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীতে যারা আজ শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন, তাদের অনেকেই একসময় চরম ব্যর্থ হয়েছিলেন। সাময়িক পরাজয়কে জয় করেই তারা আজ বিশ্বমঞ্চে অমর ও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
সাময়িক ব্যর্থতার এই মুহূর্তে প্রথম কাজ হলো ধৈর্য ধারণ করা। আবেগতাড়িত হয়ে কোনো ভুল বা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ধৈর্য মানুষকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি শান্ত মাথায় মোকাবিলা করার শক্তি দেয়। কঠিন সময় চিরকাল থাকে না, কিন্তু ধৈর্যশীল মানুষের সুসময় ঠিকই আবার ফিরে আসে।

মন থেকে সব ধরনের নেতিবাচক হতাশা ও গ্লানি সম্পূর্ণ বর্জন করো। হতাশা মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা ও কর্মস্পৃহা ধ্বংস করে দেয়। যা ঘটে গেছে তা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। তাই অতীত নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানকে কাজে লাগানোর শপথ নাও। নতুন দিনের আলো তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

এই মুহূর্তে নিজের মানসিক মনোবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। মনকে বোঝাতে হবে যে তুমিও একদিন অবশ্যই সফল হতে পারবে। ইতিবাচক চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে মনের শক্তিকে আবার জাগ্রত করো। প্রবল মানসিক শক্তিই মানুষকে যেকোনো বিপর্যয় থেকে টেনে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

এখন শান্ত মাথায় নিজের অতীতের ভুলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংশোধন করতে হবে। কোথায় কমতি ছিল বা পড়াশোনায় কী ভুল ছিল তা খুঁজে বের করো। নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যে মানুষ এগোয়, তার সফল হওয়া অনিবার্য।

পড়াশোনায় নিয়মিত অধ্যবসায় ও নিয়মানুবর্তিতা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট রুটিন মেনে গভীরভাবে পড়াশোনা করার অভ্যাস গড়ে তোলো। সময়ের অপচয় রোধ করে পড়ায় মনোযোগী হলে যেকোনো কঠিন বিষয় সহজ হয়ে যায়।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে শিক্ষক বা অভিজ্ঞদের সুচিন্তিত পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। তারা তোমাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে ভুলের অন্ধকার থেকে আলোতে আনবেন। নিজের একগুঁয়েমি পরিহার করে বড়দের অভিজ্ঞতার আলোয় পথ চলা বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক পরামর্শ তোমার আগামী দিনের পথকে অনেক মসৃণ ও সুন্দর করবে।

প্রয়োজনে আগের পড়াশোনার পরিকল্পনা ও কৌশল পুরোপুরি পরিবর্তন করতে পারো। যে পদ্ধতিতে পড়ে ফল ভালো হয়নি, তা বদলে নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করো। পড়ার পরিবেশ ও কৌশল পরিবর্তন করলে মনোযোগ ও কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সঠিক কৌশলে অল্প পরিশ্রমেও চমৎকার ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়।

যেকোনো মূল্যে জীবনে কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। জয়-পরাজয় নিয়েই মানুষের এই সংক্ষিপ্ত ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা গড়ে ওঠে। একবার পড়ে গিয়ে উঠে না দাঁড়ালে চিরকাল নিচেই পড়ে থাকতে হবে। তাই বারবার আছাড় খেলেও আবার উঠে দাঁড়ানোর অদম্য মানসিকতা বুকে ধারণ করতে হবে।

নিজের ভেতরের সুপ্ত মেধা ও শক্তির ওপর দৃঢ় আত্মবিশ্বাস বজায় রাখো। তুমিও যে ভালো কিছু করতে পারো, এই বিশ্বাস মনেপ্রাণে ধারণ করো। আত্মবিশ্বাসী মানুষ পাহাড়সম বাধাও অনায়াসে ডিঙিয়ে যেতে পারে। নিজের প্রতি আস্থা হারালে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তোমাকে টেনে তুলতে পারবে না।

দ্বিগুণ উদ্দীপনা ও শক্তি নিয়ে পুনরায় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করো। পেছনের ব্যর্থতাকে অভিজ্ঞতার চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে সামনে এগিয়ে যাও। এবারের প্রস্তুতি যেন হয় নিখুঁত, জোরালো ও অত্যন্ত সুসংহত। পুনরায় চেষ্টা করার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিতে হবে।

এই সংকটময় মুহূর্তে পরিবার ও বন্ধুদের আন্তরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। একা একা মানসিক কষ্টে না ভুগে প্রিয়জনদের সঙ্গে মনের কথা প্রকাশ করো। সবার সম্মিলিত ভালোবাসা ও মানসিক সহযোগিতা তোমাকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করবে। একা থাকার চেয়ে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
বুকের গভীরে সাফল্যের এক অদম্য ও তীব্র প্রত্যয় জাগ্রত করো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করো যে আগামীতে তুমি অবশ্যই সেরাদের একজন হবে। এই জেদ ও সংকল্প তোমাকে কাজে তাগিদ জোগাবে। সংকল্প যদি দৃঢ় হয়, তবে মহাবিশ্বের কোনো বাধাই তোমাকে থামাতে পারবে না।

সর্বোপরি মনে রাখবে, ব্যর্থতাই হলো প্রকৃত সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। প্রতিটি ব্যর্থতা মানুষকে নতুন করে শিক্ষা দেয় এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করে তোলে। ব্যর্থ না হলে সফলতার আসল স্বাদ ও মূল্য কখনো অনুধাবন করা যায় না। তাই এই ফলকে জীবনের শেষ না ভেবে, নতুন জয়ের সূচনা মনে করো।

ঝড়ের রাতেও যদি ভেঙে পড়ে আশার তরু,ভয় পেও না বন্ধু, ওখানেই নতুন শুরু। মেঘের আড়ালে আলো হাসে চিরদিন,শপথের আগুনে কাটো অপবাদের ঋণ। পরাজয় মানে নয় জীবনের অবসান, লড়াইয়ের মাঠে গাও বিজয়ের গান, ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার দেখাও নিজের মান।

এইচএসসি পরীক্ষার এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি আংশিক মূল্যায়ন মাত্র, জীবনের সামগ্রিক সমাপ্তি নয়। উত্তীর্ণদের যেমন বিনয়ী হয়ে আগামী দিনের দেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে, তেমনি অনুত্তীর্ণদের দ্বিগুণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সমাজ ও অভিভাবকদের উচিত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে মানসিক সাহস জোগানো।

লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ব্যর্থতা  ঘুরে দাঁড়ানো  প্রত্যয় 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: